মোবাইলের আলোয় অপারেশন, প্রসূতির জরায়ু-মূত্রথলি কেটে ফেলার অভিযোগ

বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলায় একটি ক্লিনিকে চরম অব্যবস্থাপনা ও ভুল চিকিৎসার মাধ্যমে এক প্রসূতির জীবন বিপন্ন করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় হাবিবা ক্লিনিক অ্যান্ড বারিশ ডায়াগনস্টিক সেন্টারে লাভলী ঘরামী নামের ওই নারীর সিজারের সময় জরায়ু ও মূত্রথলি কেটে ফেলার ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী পরিবার ও এলাকাবাসীর দাবি, কোনো নিবন্ধিত চিকিৎসক ছাড়াই ওই ক্লিনিকে অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করা হয়, যা চিকিৎসাব্যবস্থার চরম অবনতির এক নজিরবিহীন উদাহরণ। এই ঘটনায় অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং প্রসূতির সুচিকিৎসার জন্য যথাযথ ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সাধারণ মানুষ।

ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনায় জানা যায়, অস্ত্রোপচার চলাকালীন হঠাৎ বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে মোবাইল ফোনের ফ্ল্যাসের আলো জ্বেলে প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে অস্ত্রোপচার চালানো হয়। ভুক্তভোগী লাভলী ঘরামী অভিযোগ করেন যে, খুলনা থেকে অভিজ্ঞ চিকিৎসক এনে অপারেশন করানোর কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত স্যাকমো অমিত মন্ডল এবং ক্লিনিকের পরিচালক সাব্বির আহম্মেদ রুপম ও রফিকুল ইসলাম নিজেরাই অস্ত্রোপচার করেন। অপারেশন থিয়েটারে কোনো প্রকৃত চিকিৎসককে উপস্থিত না পেয়ে তিনি চরম আতঙ্কে পড়েন। এই অপচিকিৎসার ফলে ৪৫ দিন পেরিয়ে গেলেও তিনি মারাত্মক শারীরিক যন্ত্রণায় ভুগছেন এবং তার চিকিৎসার পেছনে দেড় লাখ টাকার বেশি প্রয়োজন বলে তিনি জানান।

এই অমানবিক ঘটনার বিচার এবং ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের শাস্তির দাবিতে সম্প্রতি উপজেলা পরিষদ চত্বরে এক মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়। ভুক্তভোগী নারী ও তার স্বামী-সন্তানসহ কয়েকশ স্থানীয় নারী-পুরুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই কর্মসূচিতে অংশ নেন। তবে শান্তিপূর্ণ এই মানববন্ধনেও বাধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। কর্মসূচি চলাকালে অভিযুক্ত ক্লিনিক পরিচালকের এক আত্মীয় নিজেকে রাজনৈতিক নেতা পরিচয় দিয়ে বাধা সৃষ্টি করেন এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনরত গণমাধ্যমকর্মীদের নানা ধরনের হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন বলে জানা গেছে।

এদিকে প্রসূতির জরায়ু ও মূত্রথলি কেটে ফেলার সমস্ত অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ। অভিযুক্ত পরিচালক সাব্বির আহম্মেদ রুপম দাবি করেছেন যে, স্যাকমো অমিত মন্ডল ওই অপারেশন করেননি এবং তাদের বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। তার ভাষ্যমতে, সিজার অপারেশনটি সম্পন্ন করেছিলেন ডা. নাসির উদ্দিন এবং রোগী সুস্থভাবেই বাড়ি ফিরেছিলেন। অন্যদিকে অভিযুক্ত চিকিৎসক ডা. নাসির উদ্দিন দাবি করেছেন যে অপারেশন সফল হয়েছিল, তবে রোগীর অবহেলার কারণেই পরে জটিলতা দেখা দেয় এবং তার চিকিৎসার খরচ বহন করতে তারা রাজি আছেন।

প্রসূতিকে ভুল চিকিৎসায় বিপন্ন করার এই ঘটনা প্রশাসনের নজরে এসেছে এবং এ নিয়ে আইনি পদক্ষেপের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। চিতলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খাদিজা আক্তার জানিয়েছেন যে, এ বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ তারা হাতে পেয়েছেন এবং বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক হিসেবে বিবেচনা করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। এর আগেও ওই ক্লিনিকের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে পরিদর্শন করা হয়েছিল। বর্তমান ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের জন্য একটি তদন্ত কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া চলছে বলে প্রশাসন সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *