ভূপেন হাজারিকার গান কেন আজও মানুষের হৃদয়ে

প্রজন্মের পর প্রজন্মের মানুষের হৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন করে নিয়েছেন কিংবদন্তিতুল্য সংগীতশিল্পী ভূপেন হাজারিকা। ১৯২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ভারতের আসামের সদিয়ায় জন্মগ্রহণকারী এই গুণী শিল্পী একাধারে সংগীতশিল্পী, কবি, সুরকার, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সাংস্কৃতিক কর্মী হিসেবে বহুমুখী প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছিলেন। তবে তার সব পরিচয় ছাপিয়ে তিনি সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মানবতার কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন, যার কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল মানুষের অধিকার ও মুক্তির জয়গান। তার গানে নিছক প্রেম বা বিনোদনের বাইরে সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম, দুঃখ-কষ্ট এবং বেঁচে থাকার অদম্য আকুতি অত্যন্ত সুনিপুণভাবে ফুটে উঠেছিল।

তার সৃষ্টির মূল শক্তি ছিল গভীর মানবিক আবেদন, যা জাতপাত, বর্ণবৈষম্য ও সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে ওঠার বার্তা দিত। ‘মানুষ মানুষের জন্য’, ‘বিস্তীর্ণ দুপারের অসংখ্য মানুষের’ কিংবা ‘গঙ্গা আমার মা, পদ্মা আমার মা’-এর মতো কালজয়ী গানগুলোতে তিনি মানুষকে মানুষ হিসেবে ভালোবাসার চিরন্তন আহ্বান জানিয়েছেন। পঞ্চাশের দশকে দাঙ্গাবিধ্বস্ত আসামে প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি গানকে বিভেদ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। প্রখ্যাত মার্কিন মানবাধিকারকর্মী পল রোবসনের মানবতাবাদী আদর্শ তাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল, যার ফলশ্রুতিতে বিশ্ববাসীর নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষের কষ্টের প্রতিচ্ছবি তার গানে রূপ নিয়েছিল।

বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির মেলবন্ধনে তৈরি ভূপেন হাজারিকার গান আসামের সীমানা পেরিয়ে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশেও সমানভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। অসমিয়া লোকসংগীতের সঙ্গে শাস্ত্রীয় ও গণসংগীতের অনন্য পসরা সাজিয়ে তিনি গণমানুষের মনের কথা ফুটিয়ে তুলেছিলেন। প্রতিবাদী ও সাম্যের গানের পাশাপাশি প্রেমের গানেও তার মুন্সিয়ানা ছিল অতুলনীয়, যা মিছিলে কিংবা নিঃসঙ্গতায় সব সময়ই শ্রোতাদের সান্ত্বনা জুগিয়েছে। ব্যক্তিগত জীবনের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে তিনি আজীবন শিল্প ও মানবতার পক্ষে নিজের অবস্থান অটুট রেখেছিলেন এবং প্রগতিশীল রাজনৈতিক ধারার সঙ্গেও সম্পৃক্ত ছিলেন।

২০১১ সালের ৫ নভেম্বর ৮৫ বছর বয়সে এই মহান শিল্পীর জীবনাবসান ঘটলেও তার সংগীতের আবেদন আজও অম্লান। সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে মরণোত্তর ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘ভারতরত্ন’সহ বিভিন্ন মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে। তবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির সীমানা ছাড়িয়ে সাধারণ মানুষের ভালোবাসা ও হৃদয়ের স্পন্দনই ছিল তার সবচেয়ে বড় অর্জন। বর্তমান সময়েও যখন মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় কিংবা মানবতার কথা বলে, তখন ভূপেন হাজারিকার গান যেন নতুন করে প্রাণ পায় এবং প্রমাণ করে যে মানুষের জন্য নিবেদিত শিল্প কখনো পুরোনো হয় না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *