অভিজাত এলাকায় খেয়া নৌকা, ৫ টাকায় পারাপার

রাজধানীর গুলশান, বনানী ও মহাখালী এলাকার বিলাসবহুল আধুনিকতার ঠিক মাঝখানে অবস্থিত একটি ছোট খালে দেখা মিলছে অন্যরকম এক বাস্তবতার। সুউচ্চ ভবন ও বিশ্বমানের সুযোগ-সুবিধায় ঘেরা এই এলাকায় যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে চলছে খেয়া নৌকা। খালের দুই তীরের জীবনযাত্রায় রয়েছে আকাশ-পাতাল ব্যবধান, যেখানে একদিকে রয়েছে অভিজাত জীবন আর অন্যদিকে কড়াইল বস্তির সুবিধাবঞ্চিত মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই। প্রাকৃতিক দুর্যোগে সর্বস্ব হারিয়ে রাজধানীমুখী হওয়া লাখো খেটে খাওয়া মানুষ এই বস্তিতে বসবাস করছেন। আর এই খালের স্বল্প দূরত্বটুকু পারাপারের জন্য বর্তমানে প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ বা খেয়া নৌকা।

সড়কপথের দীর্ঘ জ্যাম ও অতিরিক্ত খরচ এড়াতে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এই জলপথ ব্যবহার করে থাকেন। কড়াইল বস্তির বউবাজার ঘাট থেকে নৌকায় চড়ে মাত্র পাঁচ মিনিটে গুলশানে পৌঁছানো সম্ভব হয়, যার জন্য জনপ্রতি ভাড়া দিতে হয় মাত্র পাঁচ টাকা। অথচ সড়কপথে একই গন্তব্যে পৌঁছাতে প্রায় চার কিলোমিটার ঘুরতে হয় এবং খরচ হয় আশি থেকে একশ টাকা পর্যন্ত। ফলে সময় ও অর্থ সাশ্রয় করতে বস্তিবাসী ও স্থানীয় নিম্নবিত্ত মানুষের পাশাপাশি অনেক মধ্যবিত্ত নাগরিকও এই নৌকায় যাতায়াত করেন। বিশেষ করে গুলশানের বিভিন্ন বাসাবাড়িতে কর্মরত নারী গৃহকর্মী এবং বিভিন্ন শ্রমজীবীরা এই নৌপথের নিয়মিত যাত্রী।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, কড়াইল বস্তি প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই অর্থাৎ প্রায় দুই যুগ ধরে এই খালের পানি পারাপারের জন্য নৌকার প্রচলন রয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বস্তির পরিধি ও জনসংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি এই রুটে নৌকার সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে এই ঘাটে বিশটিরও বেশি নৌকা চলাচল করছে এবং সকালের শুরু থেকে শুরু করে মধ্যরাত পর্যন্ত যাত্রী পারাপার অব্যাহত থাকে। তবে দিনভর এই রুটে যাতায়াত চললেও মূলত সকালের এবং সন্ধ্যার সময়ে যাত্রীদের সবচেয়ে বেশি চাপ লক্ষ করা যায়। মাঝিমাল্লারা জানান, দিনের অন্যান্য সময়ে যাত্রীর পরিমাণ কিছুটা কম থাকে এবং মাঝিদের দীর্ঘ সময় ঘাটে অপেক্ষা করতে হয়।

এদিকে খেয়াঘাটে নৌকা চালালেও বেশিরভাগ মাঝিই এর প্রকৃত মালিক নন, বরং তারা দিনভিত্তিক চুক্তিতে অন্যের নৌকা পরিচালনা করেন। মাঝিরা সকাল থেকে দুপুর এবং দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত দুই শিফটে ভাগ হয়ে দায়িত্ব পালন করেন। তবে সম্প্রতি ভাড়ার টাকা তোলার নিয়মে পরিবর্তন আসায় মাঝিদের আয়ের পরিমাণে কিছুটা অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক মাঝি জানান, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে দৈনিক চুক্তিভিত্তিক আয় দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে এবং তারা মালিকপক্ষের কাছে তাদের বেতন ও পারিশ্রমিক বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন। সব প্রতিকূলতার মধ্যেও আধুনিক ঢাকার বুকে এই খেয়া নৌকাগুলো যেন নগরজীবনের এক অনন্য ও অপরিহার্য অংশ হয়ে টিকে রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *