রেকর্ড বৃষ্টিতে ডুবছে জাপান, সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি

প্রবল বর্ষণের কারণে জাপানের মধ্যাঞ্চলে চরম বিপর্যয়কর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, যার ফলে দেশটির বিভিন্ন জনপদ প্লাবিত হওয়ার উপক্রম হয়েছে। জাপানের আবহাওয়া সংস্থা জেএমএ জানিয়েছে, আইচি প্রিফেকচারের রাজধানী নাগোয়ায় মাত্র এক ঘণ্টার ব্যবধানে ১০৪ দশমিক ৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা ওই শহরের ইতিহাসে এক ঘণ্টার সর্বোচ্চ বৃষ্টির নতুন রেকর্ড। ভারী এই বর্ষণের ফলে আইচি ও গিফু প্রিফেকচারের বিভিন্ন এলাকায় বিপজ্জনক ‘লিনিয়ার রেইনব্যান্ড’ মেঘমালার সৃষ্টি হয়েছে, যা একই অঞ্চলে দীর্ঘক্ষণ ধরে অতি ভারী বৃষ্টি ঝরানোর জন্য দায়ী। তীব্র পানি জমে যাওয়ার কারণে সড়কপথ ও বিভিন্ন অবকাঠামো পানিতে তলিয়ে গেছে এবং কোথাও কোথাও মানুষের হাঁটুসমান পানি পর্যন্ত জমে গেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশের পশ্চিমাঞ্চল থেকে শুরু করে উত্তর-পূর্বাঞ্চল পর্যন্ত ব্যাপক ভূমিধস ও মারাত্মক বন্যার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

পরিস্থিতির চরম অবনতি হওয়ায় দেশটির কর্তৃপক্ষ ১৪টি শহর ও জনপদে সর্বোচ্চ লেভেল-৫ বন্যা সতর্কতা জারি করেছে। আইচির পাশাপাশি সেতো, কাসুগাই, কোমাকি, ইচিনোমিয়াসহ বেশ কিছু এলাকায় এই সতর্কতা কঠোরভাবে কার্যকর করা হয়েছে। লেভেল-৫ সতর্কতা জারির পর স্থানীয় বাসিন্দাদের নিজেদের আশপাশের পরিবেশ বিবেচনা করে দ্রুত সবচেয়ে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে তাদের উঁচু কোনো ভবন কিংবা নিজ বাড়ির দ্বিতীয় তলা বা তার চেয়েও ওপরে আশ্রয় নিতে বলা হয়েছে। এছাড়া নাগোয়ার চিকুসা, মরিয়ামা ও মেইতো এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার কড়া তাগিদ দেওয়া হয়েছে এবং ভূগর্ভস্থ এলাকাগুলোতে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে। অতিরিক্ত পানির চাপে নিষ্কাশন ব্যবস্থা সঠিকভাবে কাজ না করায় আন্ডারপাস, ভূগর্ভস্থ বিপণিবিতান ও পার্কিংগুলোতে পানি ঢুকে পড়ার তীব্র আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

নাগরিক জীবনে মারাত্মক এই দুর্যোগের প্রভাব পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রতিটি খাতে, যার ফলে ট্রেন ও সাবওয়ে চলাচল ব্যাহত হয়েছে। নাগোয়ার নগর সাবওয়ে পরিষেবা সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং জেআর চুও লাইনের রেললাইন পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এছাড়া টোকিওগামী তোকাইদো শিনকানসেন বুলেট ট্রেনসহ ওকায়ামা ও টোকিওর মধ্যকার ট্রেন চলাচলও কিছু সময়ের জন্য স্থগিত রাখতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। ব্যস্ত সাকায়ে এলাকায় রাস্তায় গোড়ালি পর্যন্ত পানি জমে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে গাড়ির দরজা পর্যন্ত পানি ওঠার দৃশ্য দেখা গেছে। এর পাশাপাশি আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর উদ্বোধিতব্য আসন্ন এশিয়ান গেমসের বেশ কয়েকটি ভেন্যুও বৃষ্টির পানিতে প্লাবিত হয়েছে, যা ক্রীড়া আয়োজনের প্রস্তুতিতেও বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটিয়েছে।

এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে আইচি প্রিফেকচার জুড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়েছে এবং এখন পর্যন্ত চারজন সামান্য আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পেতে প্রায় দুই হাজার সাতশ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে স্থানীয় বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। জাপানের আবহাওয়া সংস্থার প্রধান পূর্বাভাস কর্মকর্তা তাকুয়া হোসোমি দেশবাসীকে বন্যার ঝুঁকি এড়াতে দ্রুত উঁচু ও নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। আগামী দিনেও রাজধানী টোকিওসহ সাইতামা, চিবা, কানাগাওয়া, ওসাকা ও হিয়োগো প্রিফেকচারে এমন দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া বজায় থাকতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সব বিভাগ পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং সাধারণ মানুষের জীবন সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *