দুই যুদ্ধের মধ্যেই ভারতে জড়ো হচ্ছেন বিশ্বনেতারা

বিশ্বজুড়ে চলমান বিভিন্ন সংঘাত ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যেই ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে শুরু হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জোট ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন। দুই দিনব্যাপী এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানরা ইতিমধ্যে ভারতীয় রাজধানীতে এসে পৌঁছাতে শুরু করেছেন। পুরো শহরজুড়ে বিদেশি অতিথিদের স্বাগত জানিয়ে বিভিন্ন সড়ক সাজানো হয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে বিশ্বনেতাদের সাক্ষাতের নানা প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। পশ্চিমা প্রভাববলয় থেকে মুক্ত হয়ে বড় উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর লক্ষ্যে ২০০৯ সালে গঠিত এই জোটের বর্তমান সভাপতির দায়িত্ব পালন করছে ভারত। ফলে এবারের সম্মেলনকে কেন্দ্র করে কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

সম্মেলনে যোগ দিতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা ইতিমধ্যে দিল্লি পৌঁছেছেন। মূলত ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সদস্য দেশগুলোর ভিন্নমুখী অবস্থান এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়গুলো এবারের এজেন্ডায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। এর পাশাপাশি দীর্ঘ ছয় বছর পর চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ভারত সফর এই সম্মেলনের অন্যতম প্রধান কূটনৈতিক আকর্ষণ হিসেবে দেখা দিয়েছে। ২০২০ সালের গালওয়ান উপত্যকা সংঘাতের পর দুই দেশের সম্পর্কে দীর্ঘস্থায়ী শীতলতা বিরাজ করলেও, সাম্প্রতিক সময়ে বিমান যোগাযোগ ও কূটনৈতিক আলোচনা পুনরায় চালুর মাধ্যমে সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করেছে এবং এই সম্মেলনের ফাঁকে নরেন্দ্র মোদী ও শি জিনপিংয়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ব্রিকস জোটের পারস্পরিক অগ্রাধিকার ক্ষেত্রগুলোতে সহযোগিতা আরও সুদৃঢ় করার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিষয়গুলো নিয়ে নেতারা বিস্তারিত মতবিনিময় করবেন। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব জোরদার এবং আন্তর্জাতিক সংকটের প্রভাব মোকাবিলায় যৌথ কৌশল নির্ধারণের ওপরও বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক বার্তায় আশা প্রকাশ করেছেন যে, এই দুই দিনের বৈশ্বিক সম্মেলন বিশ্বকল্যাণের স্বার্থে অত্যন্ত ইতিবাচক এবং ফলপ্রসূ আলোচনা বয়ে আনবে। এছাড়া রুশ ও ইরানি রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে ভারতের পৃথক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকেও বাণিজ্যিক সম্পর্ক প্রসারের বিষয়টি প্রধান্য পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনকে ঘিরে নয়াদিল্লিতে নেওয়া হয়েছে নজিরবিহীন ও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রায় ১৫ হাজার দিল্লি পুলিশ সদস্যের পাশাপাশি দুইশ কোম্পানি আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে এবং বিমানবন্দর থেকে সম্মেলনস্থল পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় পাঁচশটির বেশি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সিসিটিভি ক্যামেরা ও মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তির মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো হচ্ছে। ট্রাফিক পুলিশ জানিয়েছে যে পুরো শহর অবরুদ্ধ না থাকলেও ভিভিআইপি অতিথিদের যাতায়াতের সময় নির্দিষ্ট সড়কগুলোতে সাময়িক যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হবে, যাতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ ন্যূনতম পর্যায়ে রাখা সম্ভব হয়। কঠোর এই নিরাপত্তা বলয়ের মধ্য দিয়ে বিশ্বনেতাদের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই ব্রিকস সম্মেলন বর্তমান ভূরাজনীতিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *