হতে পারতেন ‘আরেক শচিন’, কুয়াশার রাতের এক দুর্ঘটনায় সব শেষ

ভারতীয় ক্রিকেটে বর্তমানে বৈভব সূর্যবংশীকে নিয়ে যেমন ব্যাপক আলোচনা ও উন্মাদনা দেখা যায়, বহু বছর আগে প্রায় একই রকম আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন ধ্রুব মহেন্দ্র পান্ডোভ। কিংবদন্তি ক্রিকেটার শচিন টেন্ডুলকারের সমসাময়িক এই তরুণ প্রতিভাকে তখন ভারতীয় ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ মহাতারকা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল। উড়িষ্যায় একটি দেওধর ট্রফির ম্যাচ শেষ করে আম্বালায় পৌঁছানোর পর তার গন্তব্য ছিল পাটিয়ালায় নিজের বাবা-মায়ের কাছে। কিন্তু উত্তর ভারতের তীব্র শীতের ঘন কুয়াশা এবং অত্যন্ত কম দৃশ্যমানতার কারণে তার সেই যাত্রা এক ট্র্যাজেডিতে রূপ নেয়। তৎকালীন ক্রিকেটার চেতন শর্মা তাকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া পর্যন্ত আম্বালায় অপেক্ষা করার পরামর্শ দিলেও আসন্ন একটি ম্যাচের তাগিদে তিনি দ্রুত রওনা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

তাক্সি নিয়ে গন্তব্যের দিকে রওনা হওয়ার পথেই এক মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হন এই উদীয়মান ক্রিকেটার। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে মাত্র ১৮ বছর বয়সে না ফেরার দেশে চলে যান ধ্রুব। সে সময় তিনি ভারতীয় টেস্ট দলে জায়গা পাওয়ার খুব কাছাকাছি পৌঁছান এবং নির্বাচকদের নজর কেড়েছিলেন। তার এই আকস্মিক ও অকাল প্রয়াণ কেবল ভারতীয় ক্রিকেট অঙ্গনকেই স্তম্ভিত করেনি, বরং পান্ডোভ পরিবারে এক অপূরণীয় ও গভীর শূন্যতার সৃষ্টি করে। সন্তানের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুর পর ধ্রুবর মা তার ছোট ভাই কুনালকে আর ক্রিকেট খেলতে দেননি এবং তার সব ক্রিকেটের সরঞ্জাম পুড়িয়ে ফেলেছিলেন।

খেলার মাঠে ধ্রুবর প্রতিভার দ্যুতি ছিল অবিশ্বাস্য, যা তার পরিসংখ্যান থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শচিন টেন্ডুলকার যেখানে ১৫ বছর বয়সে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে পা রেখেছিলেন, সেখানে ধ্রুব মাত্র ১৩ বছর বয়সে পাঞ্জাবের হয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক ঘটিয়েছিলেন। এর পরের বছরই মাত্র ১৪ বছর বয়সে তিনি প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সেঞ্চুরি হাঁকান, যেখানে শচিনের এই মাইলফলক ছুঁতে ১৫ বছর বয়স হয়েছিল। এছাড়া ১৭ বছর বয়সে রঞ্জি ট্রফিতে ১ হাজার রান পূর্ণ করে সবচেয়ে কম বয়সে এই কীর্তি গড়ার রেকর্ডও নিজের নামের পাশে লিখেছিলেন তিনি। সতীর্থ ও প্রতিপক্ষ ক্রিকেটারদের কাছেও তিনি ছিলেন এক বিস্ময়বালক, যার মধ্যে খেলার অসাধারণ বোঝাপড়া ও নির্ভীক মানসিকতা লক্ষ্য করা যেত।

কিংবদন্তি স্পিনার অনিল কুম্বলে থেকে শুরু করে সাবেক ব্যাটার বিক্রম রাঠোর ও অজয় জাদেজা—সবাই পরবর্তী সময়ে ধ্রুবর অসাধারণ প্রতিভা ও ক্রিকেটীয় বুদ্ধিমত্তার কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছেন। জাদেজা তাকে অত্যন্ত নির্ভীক ও লড়াকু মানসিকতার অধিকারী হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন, যিনি যেকোনো পরিস্থিতিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে বিন্দুমাত্র ভয় পেতেন না। দুর্ঘটনার প্রায় সাড়ে তিন দশক পেরিয়ে গেলেও ধ্রুবর সেই স্মৃতি ও পরিসংখ্যান আজও ভারতীয় ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে হাহাকার জাগায়। সেদিন যদি সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি না ঘটত, তবে হয়তো ভারতীয় ক্রিকেট দল আরও অনেক আগেই একজন বিশ্বমানের তারকাকে পেত, যার উত্তর আজও অজানা রয়ে গেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *