ভাব তরঙ্গ: বাউল গানে মুখরিত ময়মনসিংহের জয়নুল উদ্যান

আধুনিকতার প্রভাবে তরুণ প্রজন্ম যেন নিজেদের শেকড় এবং লোকজ ঐতিহ্য ভুলে না যায়, সেজন্য ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র নদের তীরবর্তী জয়নুল উদ্যানে নিয়মিতভাবে মরমী গানের আসর বসানো হচ্ছে। ‘ভাব তরঙ্গ’ নামের এই আয়োজনের মাধ্যমে দেশীয় সংস্কৃতির চর্চা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা ইতোমধ্যে স্থানীয় সংস্কৃতিপ্রেমীদের মাঝে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। গত ১১ সেপ্টেম্বর এই আয়োজনের ধারাবাহিকতায় অনুষ্ঠিত হয় তৃতীয় পর্ব, যা উৎসর্গ করা হয়েছিল বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের স্মৃতির উদ্দেশ্যে। স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘সমাজ রূপান্তর সাংস্কৃতিক সংঘ’ এই ব্যতিক্রমী ও প্রশংসনীয় মরমী লোকসংগীতের আসরটির সার্বিক আয়োজন করে থাকে।

সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা থেকে শুরু হওয়া এই করিম পর্বে বাউল সাধক শাহ আব্দুল করিমের কালজয়ী ও আধ্যাত্মিক ভাবধারার গানগুলো একে একে পরিবেশন করেন ময়মনসিংহের স্থানীয় শিল্পীরা। ব্রহ্মপুত্রের শীতল বাতাস আর দোতারা, একতারা, হারমোনিয়াম, ঢোল, মন্দিরা ও তবলার সুরের মূর্ছনায় পুরো বধ্যভূমি প্রাঙ্গণ এক মরমী আবহে ভরে ওঠে। অসাম্প্রদায়িক চেতনার গান ‘তুমিও মানুষ আমিও মানুষ, সবাই এক মায়ের সন্তান’ পরিবেশনের মধ্য দিয়ে এ আসরের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এরপর একে একে ‘মুর্শিদ ধন হে’, ‘গাড়ি চলে না, চলে না’ এবং ‘আমি কুলহারা কলঙ্কিনী’র মতো জনপ্রিয় ও ভক্তিমূলক গান গেয়ে শোনান শিল্পীরা।

এই মনোমুগ্ধকর আসরে গান পরিবেশন করেন বাউল সাধক জালাল শাহ চিশতি, আব্দুল জব্বার, স্বদেশ তালুকদার, মো. শহীদুল ইসলাম, মো. আব্দুল হাফিজ, মো. সিরাজ মণ্ডল ও বিল্লাল ফকিরের মতো গুণী শিল্পীরা। কণ্ঠের জাদুর পাশাপাশি বাদ্যযন্ত্রের নিখুঁত মেলবন্ধন দর্শক-শ্রোতাদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে। হারমোনিয়ামে শহীদুল ইসলাম ও স্বদেশ সরকার, ঢোলে আলমগীর হোসেন রানা, মন্দিরায় বিল্লাল হোসেন এবং তবলায় সৈয়দ আরমান হোসেন ইমনের যুগলবন্দি পুরো পরিবেশটিকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। প্রতিটি পরিবেশনার পর উপস্থিত শ্রোতাদের করতালিতে মুখরিত হয়ে ওঠে জয়নুল উদ্যানের খোলা চত্বর।

আয়োজক সংগঠনের সভাপতি ইমতিয়াজ আহমেদ জানান, গত ১০ জুলাই লালনগীতি পরিবেশনের মাধ্যমে ভাব তরঙ্গের প্রথম যাত্রা শুরু হয়েছিল এবং ১৪ আগস্ট দ্বিতীয় পর্বে অনুষ্ঠিত হয় জালাল উদ্দীন খাঁর দেহতত্ত্ব নিয়ে বিশেষ আয়োজন। মাটির কাছাকাছি থেকে বাউল সাধকদের সহজাত দর্শন সাধারণ মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া এবং অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলাই তাদের মূল উদ্দেশ্য। উদ্যোক্তাদের মতে, লোকসংগীত নিছক বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং এর সঙ্গে বাংলার মানুষের জীবনবোধ, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং চিরায়ত সংস্কৃতি গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *