স্ত্রীসহ ফারইস্ট লাইফের নজরুলের ৫৭ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ

গ্রাহকদের সঞ্চয়ের অর্থ আত্মসাৎ ও প্রতিষ্ঠানের নামে অতিরিক্ত মূল্যে জমি কেনার অভিযোগে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানির সাবেক চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম এবং তার স্ত্রী তাসলিমা ইসলামের নামে থাকা বিশাল পরিমাণ স্থাবর সম্পদ ক্রোকের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের বিচারক মো. শাহজাহান কবির এই আদেশ দেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিভিন্ন ব্যাংকে এফডিআর করার নামে গ্রাহকদের অর্থ অবৈধভাবে সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি কোম্পানির তহবিল তছরুপের মাধ্যমে এসব সম্পদ অর্জন করা হয়েছে। অভিযুক্ত দম্পতির বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ইতিমধ্যে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং মামলার তদন্ত কার্যক্রম জোরালোভাবে পরিচালিত হচ্ছে। আদালত থেকে দেওয়া আদেশে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, ক্রোক করা এসব স্থাবর সম্পত্তি কোনোভাবেই বিক্রি, হস্তান্তর কিংবা বিনিময় করা যাবে না।

দুদক সূত্র জানায়, ফারইস্ট লাইফের সাবেক প্রধান নজরুল ইসলামের নামে ঢাকা, ময়মনসিংহ, মুন্সীগঞ্জ, পটুয়াখালী, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় ২০টি দলিলে বিপুল পরিমাণ স্থাবর সম্পদ রয়েছে। যার সরকারি দলিলমূল্য প্রায় ৩৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকা হলেও বর্তমান বাজারমূল্য এর চেয়ে বহুগুণ বেশি। রাজধানীর গুলশান ও বারিধারা এলাকায় দামি বাড়ি ও প্লট ছাড়াও উত্তরা, যাত্রাবাড়ী, ময়মনসিংহের ভালুকা, মুন্সীগঞ্জ এবং কুয়াকাটায় তার বিস্তীর্ণ জমি ও পুকুর রয়েছে। অন্যদিকে, তার স্ত্রী তাসলিমা ইসলামের নামে ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ ও গাজীপুর এলাকায় প্রায় ২২টি দলিলের মাধ্যমে ১৯ কোটি ২২ লাখ টাকার বেশি মূল্যের স্থাবর সম্পত্তি অর্জিত হয়েছে। তাসলিমার সম্পত্তির মধ্যে গুলশানে বাড়ি, বড় আয়তনের একাধিক ফ্ল্যাট এবং খিলক্ষেত, ক্যান্টনমেন্ট ও বাড্ডা এলাকায় মূল্যবান জমি ও ভবন রয়েছে। এসব সম্পদ যাতে অভিযুক্তরা গোপনে অন্যত্র হস্তান্তর বা বিক্রি করতে না পারেন, সেজন্য দুদকের অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা আইনি বিধান অনুযায়ী ক্রোকের আবেদন করেছিলেন।

দেশের গণ্ডি পেরিয়ে অভিযুক্ত নজরুল ইসলামের বিদেশে অর্থ পাচার এবং স্থাবর সম্পদ অর্জনের চাঞ্চল্যকর তথ্যও উদঘাটিত হয়েছে। দুদকের অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৫ সালে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মার্কিন ডলার—যা বাংলাদেশি মুদ্রায় তিন কোটি টাকার অধিক—যুক্তরাষ্ট্রে পাচার করে ওয়েলিংটন শহরে একটি বিলাসবহুল বাড়ি কেনা হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে এই বাড়ি ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের সুনির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করতে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট বা এমএলএআর পাঠানোর চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে দুদক। এছাড়া নজরুল ইসলাম ও তার পরিবারের সদস্যদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব রয়েছে বলেও তথ্য পেয়েছে তদন্তকারী দল। তিনি দেশের বেশ কয়েকটি নামী অভিজাত ক্লাবের আজীবন বা নিয়মিত সদস্য হিসেবে যুক্ত রয়েছেন, যা তার বিলাসবহুল জীবনযাত্রার চিত্র তুলে ধরে।

গ্রাহকদের অর্থ আত্মসাৎ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে নজরুল ইসলাম ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত প্রায় সাতটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। গত বছর ঢাকার একটি বিশেষ আদালত তাকে গ্রেপ্তার করে এবং পরবর্তীতে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। রিমান্ডে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই তার দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এসব বেনামী ও নামস্বাক্ষরিত স্থাবর সম্পদের বিবরণ সংগ্রহ করা হয়। দুদকের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এসব মামলায় আত্মসাৎ করা মোট অর্থের পরিমাণ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। বর্তমানে মামলাগুলোর তদন্ত চলমান রয়েছে এবং অপরাধের পরিধি বিবেচনায় আরও নতুন মামলা দায়ের করার প্রক্রিয়াও হাতে নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *