সুপার এল-নিনো: সত্যিই কি মারা যাবে সাড়ে ৪ লাখ মানুষ, ঝুঁকিতে কোন দেশগুলো?

চলমান শক্তিশালী সুপার এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে আগামী বছরের শুরু নাগাদ প্রায় সাড়ে চার লাখ অতিরিক্ত প্রাণহানির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন গবেষকেরা। সম্প্রতি বৈশ্বিক গবেষণা সংস্থা ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাব বা সিআইএলের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে। গবেষকদের মতে, অস্বাভাবিক এই উষ্ণতা ও চরম তাপপ্রবাহ জনস্বাস্থ্যকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে এবং এটি আগামী দিনের জলবায়ু সংকটের একটি পূর্বাভাস মাত্র। বৈশ্বিক উষ্ণতার এই ঊর্ধ্বগতি মানুষের স্বাভাবিক সহ্যক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে, যা বিশ্ববাসীর জন্য এক বড় সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা দিয়েছে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, চলতি বছরের জুন থেকে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ নাগাদ স্বাভাবিক বছরের তুলনায় প্রায় ৪ লাখ ৫১ হাজার অতিরিক্ত তাপজনিত মৃত্যু হতে পারে। ২৪ হাজারের বেশি অঞ্চলের স্থানীয় জলবায়ু ও মানুষের ঝুঁকিপ্রবণতা বিশ্লেষণ করে এই হিসাব প্রস্তুত করা হয়েছে। গবেষকদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত উষ্ণ দিনের সংখ্যা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৪৪ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। ১৯৯৬ থেকে ২০২৫ সালের গড় তাপমাত্রার সঙ্গে তুলনা করে এই সম্ভাব্য মৃত্যুর হিসাব কষা হয়েছে, যা খুব শীঘ্রই একটি পিয়ার-রিভিউড জার্নালে প্রকাশিত হবে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং মানুষের জীবন রক্ষায় উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে প্রশমনমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার জোরালো সুপারিশ করেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি। চরম তাপমাত্রার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে তাপপ্রবাহের আগাম সতর্কতা জারি, চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে কর্মী সংখ্যা বাড়ানো এবং নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করতে শীতলীকরণ কেন্দ্র চালুর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এছাড়া তীব্র গরমে বাইরে কাজ করা খেটে খাওয়া শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে প্রতিবেদনে। যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ মাইকেল গ্রিনস্টোন মনে করেন, সঠিক সময়ে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিলে হাজার হাজার মানুষের অমূল্য জীবন বাঁচানো সম্ভব।

বিজ্ঞানীদের মতে, নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অন্তত শূন্য দশমিক পাঁচ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গেলে এল নিনো চক্রের সৃষ্টি হয়। চলতি বছর প্রশান্ত মহাসাগরে বাতাস প্রবাহের ধরনে পরিবর্তন আসায় প্রচুর পরিমাণে উষ্ণ পানি এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তরিত হয়েছে। এর ফলে সমুদ্রের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি বেড়ে গিয়ে সুপার এল নিনোর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া দপ্তর এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এই প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র কেবল তাপমাত্রাই বাড়াচ্ছে না, বরং বৈশ্বিক বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ধরনকেও মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।

এল নিনোর প্রভাবে দক্ষিণ আমেরিকা, পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ও ভারতীয় মৌসুমী বায়ু প্রভাবিত এলাকায় বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে, দক্ষিণ আফ্রিকার মতো অঞ্চলে খরার ঝুঁকি বৃদ্ধির পাশাপাশি বৈশ্বিক কৃষিকাদ্য উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের জলবায়ুবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ফ্রিডেরিকে অটো সতর্ক করে বলেছেন, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন এবং জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নির্গত অতিরিক্ত তাপ এল নিনোর এই ধ্বংসাত্মক প্রভাবকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাই বৈশ্বিক উষ্ণতা রোধে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে মানবজাতিকে আরও বড় ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *