প্রাথমিক বিদ্যালয়: ৭০৭টি স্কুলে ৬০৫ শিক্ষকের পদ শূন্য, পিছিয়ে শিক্ষার্থীরা

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকট দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করছে, যা সামগ্রिक শিক্ষা ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষকের ঘাটতি থাকায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা মারাত্মক বিঘ্নিত হচ্ছে। সম্প্রতি প্রকাশিত প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্যানুযায়ী, জেলার মোট ৭০৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকের অনুমোদিত পদ রয়েছে ৪ হাজার ৭৫৩টি। এর বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন ৪ হাজার ১৪৮ জন শিক্ষক, ফলে দীর্ঘদিন ধরে ৬০৫টি পদ শূন্য পড়ে রয়েছে। শিক্ষক স্বল্পতার এই দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার কারণে প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে।

শিক্ষক সংকটের সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বিদ্যালয়ের দৈনন্দিন পাঠদান ও শিক্ষকদের ওপর। পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় কর্মরতদের ওপর বাড়তি কাজের চাপ তৈরি হচ্ছে এবং কোনো শিক্ষক ছুটিতে গেলে অন্যদের একাধিক শ্রেণির ক্লাস একসঙ্গে সামলাতে হচ্ছে। পশ্চিম আনারপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রুহুল আমীন জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানে ১৯৪ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে ছয়টি পদের মধ্যে একজন সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। তাকে একাই প্রতিদিন সাতটি করে ক্লাস নিতে হয়, যার ফলে ক্লাসে প্রয়োজনীয় শিক্ষণ উপকরণ ব্যবহার করা সম্ভব হয় না এবং শিক্ষার্থীদের পাঠে ঘাটতি থেকেই যায়। একইভাবে দেওপুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাজমী খাতুন জানান, প্রশাসনিক কাজের পাশাপাশি শিক্ষক স্বল্পতার কারণে অন্য চার শিক্ষককে চরম চাপের মধ্যে পাঠদান পরিচালনা করতে হচ্ছে।

শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মৌলিক শিক্ষা অর্জনের চিত্রও যথেষ্ট উদ্বেগজনক। কিছুদিন আগে প্রকাশিত মৌলিক সাক্ষরতা ও গাণিতিক দক্ষতার জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ এখনো তাদের বয়সে উপযোগী মৌলিক দক্ষতা অর্জন করতে পারেনি। জরিপ অনুযায়ী, তৃতীয় শ্রেণির প্রায় ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থী সাবলীলভাবে বাংলা পড়তে ব্যর্থ হচ্ছে, যা তাদের পরবর্তী শ্রেণির পড়ালেখাকে কঠিন করে তুলছে। এছাড়া চতুর্থ শ্রেণির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শিক্ষার্থী যোগ, বিয়োগ, গুণ ও ভাগের মতো মৌলিক গাণিতিক কার্যক্রমে কাঙ্ক্ষিত যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ইংরেজিতেও বেশ বড় ধরনের দুর্বলতা রয়েছে, যেখানে ৩৭ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী সাবলীলভাবে ইংরেজি পাঠে অক্ষম।

শিক্ষার এই বেহাল দশা এবং কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জনে ব্যর্থতার পেছনে কেবল শিক্ষক সংকটকেই একমাত্র কারণ হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। শিক্ষক স্বল্পতার পাশাপাশি বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক বণ্টনের সুষম নীতি এবং অন্যান্য কাঠামোগত বিষয়ও শিক্ষার মানের ওপর প্রভাব ফেলছে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে উদ্ভূত শিক্ষক সংকট নিরসনে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ জানিয়েছে যে শূন্য পদ পূরণের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগ ও সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা না গেলে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের শিক্ষার ভিত্তি আরও দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *