কেন অনামিকাতেই আংটি পরা হয়? জানুন বিয়ের আংটির অজানা ইতিহাস

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে বর্তমানে প্রিয় মানুষকে আংটি দিয়ে বিয়ের প্রস্তাব বা বাগদানের দৃশ্য অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বর্তমান যুগে আংটি বদল ছাড়া বাগদান বা বিয়ের কথা কল্পনাই করা যায় না। আঙুলে ছোট একটি ধাতব রিং পরিয়ে জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার এই সংস্কৃতি আমরা মূলত পূর্বসূরিদের কাছ থেকে পেয়েছি। তবে এই সুন্দর প্রথার পেছনে লুকিয়ে আছে সুদীর্ঘ ইতিহাস, সাংস্কৃতিক বিবর্তন এবং আধুনিক বিপণন কৌশলের এক চমকপ্রদ গল্প।

বিয়ে বা বাগদানের আংটি সাধারণত বাঁ হাতের চতুর্থ আঙুল অর্থাৎ অনামিকাতেই পরানো হয়। প্রাচীন রোমান ও গ্রিকদের বিশ্বাস ছিল, এই আঙুলের সঙ্গে সরাসরি হৃদয়ের সংযোগকারী একটি বিশেষ শিরা রয়েছে, যাকে বলা হতো ভালোবাসার শিরা। আধুনিক বিজ্ঞান এই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করলেও রোমান্টিক এই লোকবিশ্বাসটি ঐতিহ্য হিসেবে আজও টিকে রয়েছে। প্রাচীন মিসরীয় সভ্যতায় আংটির বৃত্তাকার রূপকে অনন্তকালের প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হতো, যার কোনো শুরু বা শেষ নেই।

মধ্যযুগে আংটির নকশায় হীরা, রুবি ও স্যাফায়ারের মতো রত্নের ব্যবহার শুরু হয়। ইউরোপে এই সময়ে নানা ধরনের বিশেষ নকশার আংটি বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করে। ষোলো শতকে গিমেল রিং নামে এক ধরনের আংটি চালু হয়, যা বাগদানের পর একত্র করে কনের আঙুলে পরানো হতো। অন্যদিকে আইরিশদের ক্ল্যাডা আংটিতে দুটি হাত দিয়ে হৃদয় ধরে রাখার নকশা খচিত থাকত। এমনকি গোঁড়া খ্রিষ্টীয় সমাজে অলংকার নিষিদ্ধ থাকায় কনেরা থিম্বল বা সেলাইয়ের আঙুলপেশ কেটে আংটি হিসেবে ব্যবহার করত।

বিয়ে ও বাগদানের আংটিতে হীরা ব্যবহারের প্রচলন শুরু হয় মূলত মধ্যযুগের শেষভাগে, যা পরে বিশাল বাণিজ্যিক রূপ নেয়। অস্ট্রিয়ার আর্চডিউক ম্যাক্সিমিলিয়ান প্রথম হীরাখচিত আংটি উপহার দিয়ে অভিজাত সমাজে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। পরবর্তীতে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আধুনিক বিজ্ঞাপনী প্রচারণার ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যেও হীরার আংটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। শুরুতে কেবল নারীদের জন্য আংটি পরার রীতি থাকলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে পুরুষদের মধ্যেও এর প্রচলন শুরু হয়।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আংটির নকশা, উপাদান ও ট্রেন্ডে নানা পরিবর্তন এসেছে। আজকাল অনেকেই পরিবেশবান্ধব ল্যাবে তৈরি হীরা কিংবা কাস্টমাইজড আংটি বেছে নিচ্ছেন। তবে নকশা বা উপাদানে যতই বৈচিত্র্য আসুক না কেন, এর মূল তাৎপর্য কিন্তু অপরিবর্তিত রয়েছে। শত শত বছর ধরে ধাতুর তৈরি এই ছোট্ট বৃত্তটি দুজন মানুষের ভালোবাসা, অগাধ বিশ্বাস এবং আজীবন একসঙ্গে থাকার এক নীরব প্রতিশ্রুতি বহন করে চলেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *