চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণের প্রতিযোগিতায় তিন পরাশক্তি

ভবিষ্যতের মহাকাশ অভিযানকে আরও দীর্ঘস্থায়ী ও ফলপ্রসূ করার লক্ষ্যে পৃথিবীর উপগ্রহ চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের জোরালো প্রস্তুতি শুরু করেছে বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলো। মূলত যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা, চীন এবং রাশিয়া এই অভিনব প্রতিযোগিতায় একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। চাঁদের বুকে দীর্ঘস্থায়ী বসতি স্থাপন, বিভিন্ন খনিজ সম্পদের সন্ধান এবং মঙ্গলগ্রহসহ গভীর মহাকাশে ভবিষ্যতের অভিযান পরিচালনার জন্য নিরবচ্ছিন্ন শক্তির উৎস হিসেবে এই পারমাণবিক চুল্লিগুলোকে অপরিহার্য মনে করা হচ্ছে। মহাকাশ গবেষণার এই নতুন অধ্যায় বিশ্ব রাজনীতি ও প্রযুক্তির দৌড়ে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মহাকাশের চরম পরিবেশ সহ্য করতে পারে এবং চাঁদের দক্ষিণ মেরু অঞ্চলে কোনো ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করতে পারে, এমন একটি পারমাণবিক চুল্লি তৈরির কাজ চলছে। নাসা ইতোমধ্যে নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে এই প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে এবং আগামী দশকের শেষ নাগাদ এই চুল্লিটি মহাকাশে উৎক্ষেপণের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে, চীনের সঙ্গে গোপন অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে রাশিয়াও একটি বিশেষ চন্দ্র পারমাণবিক চুল্লি তৈরির প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে চন্দ্রঘাঁটিগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে।

চাঁদের মাটিতে স্থায়ী কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হলো এর দীর্ঘস্থায়ী রাত, যা পৃথিবীর হিসাবে প্রায় দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে স্থায়ী হয়। ফলে সেখানে কেবল সৌরশক্তির ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকা বা গবেষণা চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ে, কারণ পারমাণবিক চুল্লি সূর্যের আলোর অনুপস্থিতিতেও একটানা কাজ চালিয়ে যেতে পারে। নাসার পরিকল্পনা অনুযায়ী তাদের প্রস্তাবিত চুল্লি থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি দীর্ঘ সময় ধরে মানব হস্তক্ষেপ ছাড়াই কাজ করার ক্ষমতা থাকবে। তবে এই বিশাল কর্মযজ্ঞের পেছনে প্রযুক্তিগত ও নিরাপত্তাগত বহু জটিলতা রয়েছে বলে সতর্ক করে দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রকেট উৎক্ষেপণের সময় কোনো ধরনের ব্যর্থতা ঘটলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে এবং মারাত্মক তেজস্ক্রিয় পদার্থ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। এছাড়া পৃথিবীর মতো চাঁদে এই চুল্লিগুলোকে সুরক্ষিত রাখা অত্যন্ত কঠিন হবে, যার ফলে নভোচারী ও যন্ত্রপাতির সুরক্ষায় নির্ধারিত এলাকার আশপাশে মানুষের প্রবেশাধিকার সীমিত করার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক মহাকাশ চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে কি না, তা নিয়েও এরই মধ্যে নানা মহলে আইনি ও রাজনৈতিক প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তিগত এই বিশাল চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করে পরাশক্তিগুলো সফলভাবে তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *