তিস্তা প্রকল্পে কারিগরি সহায়তা দিতে আগ্রহী নেদারল্যান্ডস

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ তিস্তা নদী প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনা এবং এ সংক্রান্ত কারিগরি ও জ্ঞানগত সহায়তা প্রদানে নিজেদের গভীর আগ্রহের কথা জানিয়েছে নেদারল্যান্ডস। সম্প্রতি সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। নেদারল্যান্ডসের বৈদেশিক বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতাবিষয়ক মন্ত্রী শুর্দ শুর্দসমার নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল এই বৈঠকে অংশ নেন এবং বাংলাদেশের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বিভিন্ন পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে মতবিনিময় করেন। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, কৃষি খাতের উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব জোরদারের ক্ষেত্রেও এই সাক্ষাৎ অত্যন্ত ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে।

বৈঠকের মূল আলোচ্যসূচিতে বদ্বীপ রাষ্ট্র হিসেবে দুই দেশের অভিন্ন পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং নদীশাসন ও ভূমি পুনরুদ্ধারের মতো বিষয়গুলো প্রধান্য পায়। বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডস উভয় দেশই জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কাজ করছে এবং এ ক্ষেত্রে নেদারল্যান্ডসের সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত উপযোগী হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ডাচ সরকারের এই সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাবকে স্বাগত জানান এবং বিশেষ করে চর উন্নয়ন ও অভিযোজনক্ষম নদীব্যবস্থাপনায় তাদের প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ওপর বিশেষ জোর দেন। দুই দেশের বিশেষজ্ঞ দলগুলো যৌথভাবে কাজ করলে দেশের দক্ষিণ ও উত্তর অঞ্চলের নদীব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়।

পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। বাংলাদেশের চলমান জ্বালানি সংকট উত্তরণে গৃহীত নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের নানা পরিকল্পনার ভূয়সী প্রশংসা করেন নেদারল্যান্ডসের মন্ত্রী। এ ছাড়াও পারস্পরিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করতে কৃষি খাতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং উন্নত জাতের বীজ উদ্ভাবনে ডাচ সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করা হয়। ইউরোপীয় বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের ধারাবাহিক প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে ডাচ সরকারের কূটনৈতিক সহযোগিতাও কামনা করে বাংলাদেশ পক্ষ।

বৈঠকে আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান এবং মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির ওপরও বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয় যে, এই সংকটের মূল উৎপত্তি মিয়ানমারে রয়েছে এবং এর স্থায়ী সমাধানও একমাত্র সেখানেই নিহিত। বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের একটি নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে জোরালো কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়। পাশাপাশি, দেশের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রকে আরও অর্থবহ করা এবং মানবাধিকার সুরক্ষার বিষয়ে বর্তমান সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

সবশেষে, দুই দেশের মধ্যকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে নেদারল্যান্ডসের মন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে তাদের দেশে আনুষ্ঠানিক সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানান। এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদি আমিনসহ সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে, ডাচ প্রতিনিধিদলে বাংলাদেশে নিযুক্ত নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূত ইওরিস ভ্যান বোমেলসহ বেশ কজন শীর্ষস্থানীয় কূটনীতিক অংশ নেন, যা ভবিষ্যতে দুই দেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্বকে আরও বেশি গতিশীল করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *