নোট-গাইডই কি যথেষ্ট

শিক্ষা ডেস্ক: শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার জগৎ থেকে মূল পাঠ্যবই ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে এবং তার স্থান দখল করে নিচ্ছে বিভিন্ন নোট, গাইড ও সাজেশনের স্তূপ। পরীক্ষা পাসের শর্টকাট উপায় হিসেবে এই সহায়ক বইগুলোর কদর বাড়লেও, এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা প্রকৃত জ্ঞান অর্জন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কারণ, গাইড বই কেবল তৈরি করা উত্তর সামনে এনে দেয়, যা মুখস্থ করে পরীক্ষায় পাস করা সম্ভব হলেও বিষয়বস্তু গভীরভাবে অনুধাবন করা যায় না। সামান্য ঘুরিয়ে প্রশ্ন করা হলে এই মুখস্থ বিদ্যার ওপর নির্ভরশীল শিক্ষার্থীরা সহজেই আটকে যায়, কারণ তারা তথ্যের সঙ্গে বাস্তব জীবনের সংযোগ স্থাপন করতে শেখেনি।

ইতিহাসের পাতায় তাকালে দেখা যায়, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই কেবল স্বউদ্যোগে বই পড়ে বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী হয়ে উঠেছেন মাইকেল ফ্যারাডে। চৌদ্দ বছর বয়সে বই বাঁধাইয়ের দোকানে কাজ করার সময় তিনি দোকানের বই পড়ার সুযোগ নেন এবং রসায়ন ও বিদ্যুতের মতো জটিল বিষয় নিয়ে পড়ালেখা শুরু করেন। কেতাবি গাইড মুখস্থ করে নয়, বরং বইয়ের বিষয়বস্তু গভীরভাবে আত্মস্থ করার ফলেই তিনি তড়িৎ আবেশের মতো যুগান্তকারী সূত্র আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন। তাঁর এই আবিষ্কারের ওপর ভিত্তি করেই আজ আধুনিক সভ্যতার সমস্ত বৈদ্যুতিক মোটর, জেনারেটর এবং ফ্যান চালিত হচ্ছে, যা প্রমাণ করে যে আনন্দ নিয়ে মূল বই পড়ার গুরুত্ব অপরিসীম।

ডিজিটাল পর্দা বনাম কাগজের বইয়ের পঠনপদ্ধতি নিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন গবেষণা চালানো হয়েছে। ২০১৮ সালে প্রকাশিত একটি বড় পরিসরের গবেষণায় দেখা গেছে, কাগজের বইয়ে পড়া শিক্ষার্থীরা স্ক্রিনে পড়া শিক্ষার্থীদের তুলনায় তথ্য অনেক ভালো বুঝতে পারে এবং পরীক্ষায় ভালো ফল করে। স্ক্রিন বা ডিভাইসে পড়ার সময় শিক্ষার্থীদের মনে এক ধরনের মিথ্যা আত্মবিশ্বাস কাজ করে যে তারা খুব দ্রুত সবকিছু বুঝে ফেলছে, কিন্তু বাস্তবে তাদের স্মৃতিশক্তি ও উপলব্ধির ক্ষমতা কম থাকে। দ্রুত স্ক্রল করার অভ্যাসের কারণে মস্তিষ্ক তথ্যের গভীরে প্রবেশ করতে পারে না, ফলে শিক্ষার্থীরা সহজেই এক ধরনের বিভ্রান্তিকর অনুভূতির ফাঁদে আটকে যায়।

শিক্ষা-মনোবিজ্ঞানীদের মতে, বইয়ের নির্দিষ্ট অংশে দাগিয়ে বারবার পড়ার কৌশলটি পড়া মনে রাখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে কম কার্যকর পদ্ধতি। এর বদলে সবচেয়ে বেশি উপকার পাওয়া যায় নিজেকে নিয়মিত যাচাই করার মাধ্যমে এবং নির্দিষ্ট বিরতিতে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুললে। নিয়ম হলো কোনো একটি অধ্যায় শেষ করার পর বই বন্ধ করে পুরো বিষয়টি নিজের ভাষায় খাতায় লেখা এবং তারপর মূল বইয়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা কোথায় ঘাটতি রয়েছে। গাইড বই কেবল একটি নির্দিষ্ট গন্তব্যের ঠিকানা দিতে পারে, কিন্তু মূল বই পড়ার অভ্যাস একজন শিক্ষার্থীকে পুরো পথ চলার একটি সঠিক মানচিত্র উপহার দেয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *