কাঠামোগত ফাঁদে আটকে আছে দেশের অর্থনীতি: হোসেন জিল্লুর রহমান

অর্থনীতি ডেস্ক: দেশের অর্থনীতি বর্তমানে কোনো সাময়িক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে না, বরং এটি একটি গভীর ও জটিল কাঠামোগত ফাঁদে আটকে রয়েছে। সম্প্রতি রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের বা পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান এই তথ্য তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন যে এই সংকটের মূল ভিত্তি তিনটি প্রধান ক্ষেত্রে গভীরভাবে প্রোথিত রয়েছে। পরিবার পর্যায়ের অর্থনৈতিক চাপ, বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং শাসনতান্ত্রিক দুর্বলতাই মূলত এই জটিল পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে।

আলোচনায় তিনি জানান যে এই কাঠামোগত ফাঁদের প্রথম এবং অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হলো সাধারণ মানুষের পারিবারিক স্তরে অর্থনৈতিক কষ্টের মাত্রা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাওয়া। অতীতে দারিদ্র্য বিমোচনের কিছু অগ্রগতি দেখা গেলেও বর্তমানে অতিদারিদ্র্য ও মাঝারি ধরনের দারিদ্র্যের হার আবার উদ্বেগজনকভাবে ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। এছাড়া চিকিৎসার অতিরিক্ত খরচ এবং আয়ের তুলনায় ঋণের বোঝা ৪৪ শতাংশের বেশি বেড়ে যাওয়ায় পরিবারগুলো চরম আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। পর্যাপ্ত চাকরির নিরাপত্তা না থাকায় এবং ছদ্ম বেকারত্ব বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

এই অর্থনৈতিক সংকটের দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং প্রবৃদ্ধির নিম্নমুখী গতির কথা উল্লেখ করা হয়। বিশ্বের অন্যান্য অনেক দেশে পরিবার পর্যায়ে কষ্ট থাকলেও বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল থাকে, কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পুরো চিত্রটিই বিপরীত। বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাও দেশের বিনিয়োগ খাতের এই শ্লথগতির বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। একই সঙ্গে দেশের রপ্তানি বাণিজ্যে তৈরি পোশাক খাতের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতা এবং অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতের স্থবিরতা অর্থনীতিকে আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মোল্লা ফজলুল হক বর্তমান আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং দাপ্তরিক ধীরগতির তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন যে নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তারা প্রযুক্তিনির্ভর সেবা প্রত্যাশা করলেও পুরোনো আমলাতান্ত্রিক নিয়মের কারণে তারা ব্যবসায়িক বিনিয়োগে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। এছাড়া সার্টিফিকেটভিত্তিক শিক্ষার পরিবর্তে দক্ষতামূলক শিক্ষার অভাব এবং শুধু সংখ্যার পরিসংখ্যান দেখানোর প্রবণতা কর্মসংস্থানে বড় বাধা সৃষ্টি করছে। এই বহুমুখী সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কেবল সাময়িক নীতি বা ব্যাংক কমিশন গঠন যথেষ্ট নয়, বরং সমাজ ও সরকারের সমন্বয়ে একটি সর্বাত্মক সংস্কার রূপরেখা বাস্তবায়নের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *