রাগ দমন: মুমিনের প্রকৃত শক্তি যেভাবে প্রকাশ পায়

ধর্ম ডেস্ক: দৈনন্দিন জীবনে বিভিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি কিংবা ছোটখাটো ঝামেলার কারণে মানুষের মনে প্রচণ্ড ক্ষোভ বা রাগ জন্ম নেওয়া খুবই স্বাভাবিক একটি মানবিক অনুভূতি। রাস্তায় চলাচলের সময় যানজট বা অন্য কোনো বাহনের আকস্মিক ধাক্কায় মেজাজ হারিয়ে ফেলা কিংবা গরমের মধ্যে ভোগান্তিতে পড়ে বিরক্তি প্রকাশ করা আমাদের অনেকেরই পরিচিত অভিজ্ঞতা। তবে এই ক্ষণিকের উত্তেজনার বশে মানুষ প্রায়শই এমন সব কথা বলে ফেলে বা আচরণ করে বসে, যা পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার পর গভীর অনুশোচনার জন্ম দেয়। একবার মুখ থেকে বেরিয়ে যাওয়া বা রাগের মাথায় করা কাজের ফল অনেক সময় আর ফেরানোর উপায় থাকে না, যা পরবর্তীতে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানও এই বাস্তবতার সত্যতা স্বীকার করেছে এবং গবেষণায় দেখা গেছে যে তীব্র রাগের মুহূর্তে মানুষের মস্তিষ্কের বিচারবুদ্ধি ও আত্মনিয়ন্ত্রণের কেন্দ্রটি সঠিকভাবে কাজ করে না। এই সময় মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ব্যাহত হয় বিধায় ভুল পদক্ষেপ নেওয়ার আশঙ্কা বহুগুণ বেড়ে যায়। ইসলাম ধর্মেও এই আবেগ নিয়ন্ত্রণের ওপর অত্যন্ত জোরালো গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে এবং পবিত্র কোরআনে মুত্তাকি বা পরহেজগার বান্দাদের অন্যতম প্রধান গুণ হিসেবে রাগ দমনের কথা বলা হয়েছে। সুরা আলে ইমরানের ১৩৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা সেই সমস্ত সৎকর্মশীল বান্দাদের প্রশংসা করেছেন, যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল উভয় অবস্থাতেই আল্লাহর পথে ব্যয় করেন এবং নিজেদের রাগ সংবরণ করে মানুষকে ক্ষমা করে দেন।

ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃত শক্তিশালী মানুষ সেই নয় যে শারীরিক শক্তিতে অন্যকে কুস্তিতে পরাস্ত করতে পারে, বরং আসল শক্তিধর হলো সেই ব্যক্তি যে রাগের চরম মুহূর্তেও নিজের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখতে সক্ষম হয়। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর অনুসারীদের রাগ না করার উপদেশ বারবার দিয়েছেন এবং এর ক্ষতিকর দিক থেকে দূরে থাকার তাগিদ দিয়েছেন। রাগের তীব্রতা কমাতে তিনি খুব চমৎকার কিছু বাস্তবসম্মত পরামর্শও দিয়েছেন, যেমন—কারও রাগ হলে তিনি যেন দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় বসে পড়েন এবং তাতেও রাগ না কমলে শুয়ে পড়েন। এই শারীরিক পরিবর্তনের মাধ্যমে শরীরের ভেতরের উত্তেজনা ও আগ্রাসী মানসিকতা অনেকটাই প্রশমিত হয়, যা মানুষকে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে রক্ষা করতে পারে।

মহানবী (সা.)-এর বর্ণাঢ্য জীবনেও রাগ দমনের এমন অনেক অনুপম দৃষ্টান্ত রয়েছে যা মানবজাতির জন্য অনুসরণীয় এক আদর্শ। একবার এক বেদুইন এসে তাঁর গায়ের চাদর সজোরে টেনে ধরলেও এবং এর ফলে কাঁধে দাগ বসে যাওয়ার মতো শারীরিক কষ্ট পেলেও তিনি কোনো রাগ বা প্রতিশোধের পথ বেছে নেননি, বরং মুচকি হেসে তাকে সাহায্য করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাই জীবনের যেকোনো কঠিন মুহূর্তে কিংবা রাগ ও ক্ষোভের উদ্রেক হলে তা প্রকাশ না করে সংবরণ করা এবং ক্ষমা প্রদর্শনের গুণটি অর্জন করা জরুরি। রাগের মুহূর্তে একটু থেমে যাওয়া, শারীরিক অবস্থান পরিবর্তন করা কিংবা তিন সেকেন্ডের জন্য নীরব থাকার মতো ছোট কৌশলগুলো মানুষকে বহু অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি ও আজীবন অনুশোচনা থেকে রক্ষা করতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *