বাবার কাছ থেকে শেখা, প্রতিমা তৈরি করেই সংসারের হাল ধরেছেন যূথীমনি

ফিচার ডেস্ক: শৈশবের দিনগুলোতে মাটির সঙ্গে গড়ে ওঠা সখ্য এবং বাবার নিখুঁত হাতের কাজ কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা শেরপুরের বয়ড়া পালপাড়ার তরুণী যূথীমনি পালের জীবনকে সম্পূর্ণ অন্য এক পথে চালিত করেছে। বাবা দিলীপ কুমার পালের মৃত্যুর পর যখন পুরো পরিবারটি গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছিল, তখন ছোটবেলার সেই স্মৃতি ও শিক্ষা তাকে ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস জুগিয়েছে। পড়াশোনার পাশাপাশি বাবার পৈত্রিক এই শিল্পকর্মকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়ে তিনি এখন তিন সদস্যের ছোট্ট সংসারের সমস্ত দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। শেরপুর মডেল গার্লস কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করা এই তরুণীর জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে এখন জড়িয়ে রয়েছে কঠোর পরিশ্রম ও সংগ্রামের এক অনন্য অধ্যায়।

পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম বাবাকে হারিয়ে শোকাচ্ছন্ন হয়ে পড়ার পরও যূথীমনি থমকে দাঁড়াননি, বরং মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে এবং ছোট বোনের পড়ালেখার খরচ জোগাতে সাহসিকতার সঙ্গে প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু করেন। মূলত দুর্গাপূজা এবং সরস্বতীপূজাকে কেন্দ্র করে বছরে এই দুই মৌসুমে তিনি মাটির প্রতিমা তৈরির কাজ করে থাকেন, যা থেকে আসা আয় দিয়ে তাদের পুরো বছরটি চলে। অত্যন্ত ধৈর্য, নিখুঁত শিল্পবোধ ও মেধার পরিচয় দিয়ে তিনি শেরপুর জেলা সদর ছাড়াও বিভিন্ন উপজেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপের জন্য প্রতিমা তৈরি করে এলাকায় বেশ ভালো সুনাম অর্জন করেছেন। আসন্ন শারদীয় উৎসবের আগে জেলার প্রায় ১৮টি মণ্ডপের প্রতিমা তৈরির বায়না পেয়ে তিনি দিনরাত পরিশ্রম করে তা সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন।

এই পুরো যাত্রায় যূথীমনির পাশে পরম ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছেন তার গৃহিণী মা রেখা রানি পাল, যিনি মেয়েকে কাজের বিভিন্ন ধাপে সাধ্যমতো সহযোগিতা করে থাকেন। মেয়ের কাজের চাপ এবং এই বয়সে তার এমন পরিশ্রমের কথা বলতে গিয়ে মা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এবং জানান যে স্বামী বেঁচে থাকার সময় যূথী শুধু আগ্রহ নিয়ে কাজ দেখত, অথচ আজ সেই মেয়েই পুরো পরিবারের ভরসার কেন্দ্রবিন্দু। এছাড়া স্থানীয় প্রবীণ কারিগররাও এই তরুণীর একাগ্রতা ও সাহসিকতার প্রশংসা করে আশা প্রকাশ করেছেন যে তিনি ভবিষ্যতে পড়াশোনা শেষ করে চারুকলায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে আরও অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারবেন।

সংসারের অভাব অনটন ও নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও যূথীমনি পালের চোখে রয়েছে এক উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন, যেখানে তিনি চারুকলা অনুষদে পড়াশোনা করে নিজের শিল্পসত্তাকে আরও বেশি শাণিত করতে চান। প্রতিমা তৈরির প্রতিটি কাজ শেষ করতে আকারভেদে ২০ হাজার থেকে ৪৫ হাজার টাকা পর্যন্ত মজুরি পেলেও এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ তিন মাস ধরে চলা অক্লান্ত শারীরিক পরিশ্রম ও রাতজাগা ক্লান্তি। উৎসবের আনন্দময় পরিবেশের নেপথ্যে থাকা এমন লড়াকু মানুষদের জীবনসংগ্রাম আমাদের সমাজে আশার নতুন আলো দেখায়, যেখানে জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করেও মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকা যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *