বাংলাদেশে বড় ঋণ খেলাপিরা কেন শাস্তি পায় না?

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের দীর্ঘদিনের একটি বড় সমস্যা হলো বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ, যা দেশের অর্থনীতিকে প্রতিনিয়ত শ্লথ করে দিচ্ছে। আর্থিক খাতের এই নাজুক পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের নীতি সহায়তা এবং কড়াকড়ি আরোপের মতো নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করে আসছে। কিন্তু এত সব উদ্যোগ সত্ত্বেও খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না, বরং তা দিন দিন আরও গভীর সংকটের রূপ নিচ্ছে। এই ক্রমাগত অবনতিশীল পরিস্থিতির কারণে দেশের সামগ্রিক আর্থিক শৃঙ্খলা নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট মহলে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।

বিশেষ করে, অপেক্ষাকৃত প্রভাবশালী ও বড় ঋণ খেলাপিদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা প্রশ্ন ও বিতর্কের জন্ম হয়েছে। সাধারণ ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হলেও, শীর্ষ ঋণখেলাপিদের বেলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রায়শই নমনীয় মনোভাব প্রদর্শন করে থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে। বড় অঙ্কের ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে তাদের বিভিন্ন ধরনের বিশেষ ছাড় বা সুবিধা দেওয়ার প্রবণতা নীতিগত বৈষম্যের বিষয়টি স্পষ্ট করে তোলে। ফলে সাধারণ মানুষ ও ছোট ব্যবসায়ীদের মাঝে এই আক্ষেপ তৈরি হয় যে, আইনের কঠোর প্রয়োগ কেবল দুর্বলদের জন্যই নির্ধারিত।

বিশ্লেষকদের মতে, ঋণখেলাপিদের এই সংস্কৃতির পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব এবং তদারকি সংস্থার যথাযথ সদিচ্ছার অভাব একটি বড় ভূমিকা পালন করছে। বড় মাপের খেলাপিরা বিভিন্ন উপায়ে পার পেয়ে যাওয়ার কারণে ব্যাংকিং খাতে একধরনের অনৈতিক সংস্কৃতির বিস্তার ঘটেছে, যা সামগ্রিক সুশাসনকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। ব্যাংকগুলোর ওপর রাজনৈতিক চাপ এবং বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার সুযোগ নিয়ে ঋণখেলাপিরা বরাবরই পার পেয়ে যান। এর ফলে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি সংস্কৃতির শেকড় আরও গভীরে প্রোথিত হচ্ছে এবং নতুন করে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

এই ধরনের অনিয়ম ও ছাড় দেওয়ার সংস্কৃতি চলতে থাকলে দেশের পুরো আর্থিক খাত একসময় মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন। খেলাপি ঋণের এই চাকা বন্ধ করতে হলে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক পক্ষপাতিত্ব ছাড়াই আইনের কঠোর শাসন প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জরুরি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি বড় খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করে, তবে এই দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসা কখনোই সম্ভব হবে না। তাই দেশের অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে ঋণখেলাপিদের বিষয়ে নীতিমালায় বড় ধরনের সংস্কার আনার দাবি জোরালো হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *