দৃশ্যপট ডেস্ক:
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথমবারের মতো টেস্ট জয়ের ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ। ডারউইনের মারারা ওভালে সিরিজের প্রথম টেস্টে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে দুই ম্যাচের সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল। ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে নেমেই এমন জয় বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
চার দিনের মধ্যেই শেষ হওয়া ম্যাচে শুরু থেকেই দাপট দেখিয়েছে বাংলাদেশ। প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়াকে মাত্র ১৯৮ রানে অলআউট করে টাইগাররা। জবাবে তানজিদ হাসানের দুর্দান্ত শতরান এবং মেহেদী হাসান মিরাজের ৬৫ রানের গুরুত্বপূর্ণ ইনিংসের ওপর ভর করে বাংলাদেশ সংগ্রহ করে ৪২৬ রান। এতে প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে বাংলাদেশের লিড দাঁড়ায় ২২৮ রান।
বাংলাদেশের হয়ে প্রথম ইনিংসে বল হাতে সবচেয়ে উজ্জ্বল ছিলেন হাসান মাহমুদ। ৫৫ রান দিয়ে ৬ উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপে বড় ধস নামান তিনি। তার দুর্দান্ত বোলিংয়ের কারণে মাত্র ৫৩ ওভারেই ১৯৮ রানে গুটিয়ে যায় স্বাগতিকরা।
দ্বিতীয় ইনিংসে অবশ্য ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে অস্ট্রেলিয়া। ক্যামেরন গ্রিন ১০৪ রানের লড়াকু ইনিংস খেলেন। কিন্তু মেহেদী হাসান মিরাজের স্পিনে আবারও চাপে পড়ে অস্ট্রেলিয়া। মিরাজ দ্বিতীয় ইনিংসে ৬৬ রান দিয়ে ৫ উইকেট নেন। শেষ পর্যন্ত ২৮৪ রানে অলআউট হয় অস্ট্রেলিয়া।
ফলে বাংলাদেশের সামনে জয়ের জন্য লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ৫৭ রান। চতুর্থ দিনের দ্বিতীয় সেশনেই সেই লক্ষ্য টপকে যায় বাংলাদেশ। ১৪.২ ওভারে এক উইকেট হারিয়ে ৫৭ রান করে ঐতিহাসিক জয় নিশ্চিত করে টাইগাররা। মুমিনুল হক ৩০ এবং শাদমান ইসলাম ২৫ রানে অপরাজিত থেকে জয় নিয়ে মাঠ ছাড়েন।
এই জয় বাংলাদেশের জন্য শুধু অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে আরেকটি টেস্ট জয় নয়, বরং অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট জয়ের ইতিহাস। এর আগে ২০০৩ সালে অস্ট্রেলিয়া সফরে গিয়ে দুই টেস্টেই পরাজিত হয়েছিল বাংলাদেশ। এরপর দীর্ঘ ২৩ বছর পর আবার অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে এসে প্রথম সুযোগেই জয় তুলে নিল টাইগাররা।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্টে এটিও বাংলাদেশের দ্বিতীয় জয়। এর আগে ২০১৭ সালে ঢাকার মিরপুরে সাকিব আল হাসানের দুর্দান্ত অলরাউন্ড পারফরম্যান্সে অস্ট্রেলিয়াকে ২০ রানে হারিয়েছিল বাংলাদেশ। প্রায় নয় বছর পর আবারও অস্ট্রেলিয়াকে হারাল বাংলাদেশ। তবে এবার জয়টি আরও বিশেষ, কারণ প্রতিপক্ষের নিজেদের মাটিতে জয়টি এসেছে।
ডারউইনের জয়টি ব্যবধানের দিক থেকেও বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। ৯ উইকেটের এই জয় বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে উইকেটের ব্যবধানে দ্বিতীয় বৃহত্তম জয়। একই সঙ্গে প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে জয় পাওয়ার কারণে এর ঐতিহাসিক মূল্য আরও বেশি।
এই ম্যাচে বাংলাদেশের ব্যক্তিগত রেকর্ডের তালিকাও দীর্ঘ। হাসান মাহমুদ ম্যাচে মোট ৯ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরার পুরস্কার পেয়েছেন। তানজিদ হাসান করেছেন ১০১ রানের দুর্দান্ত শতরান। আর মেহেদী হাসান মিরাজ ব্যাট হাতে ৬৫ রান করার পাশাপাশি দ্বিতীয় ইনিংসে ৫ উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্টে পাঁচ উইকেট নেওয়া প্রথম বাংলাদেশি স্পিনার হয়েছেন।
বাংলাদেশের জন্য আরও একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট জয় পেতে মাত্র তৃতীয় ম্যাচেই সফল হয়েছে তারা। এ দিক থেকে এশিয়ার দলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ নতুন একটি মাইলফলক স্থাপন করেছে। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এর আগে ভারত ও পাকিস্তানও টেস্ট জিতেছে, কিন্তু বাংলাদেশ তাদের তুলনায় কম ম্যাচ খেলেই এই সাফল্য অর্জন করেছে।
ম্যাচের পর বাংলাদেশের অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত এই জয়কে দলের সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক প্যাট কামিন্স স্বীকার করেছেন, ম্যাচে বাংলাদেশ সব বিভাগেই তাদের চেয়ে ভালো খেলেছে।
বাংলাদেশের এই জয় আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স বিবেচনায়। অস্ট্রেলিয়া সফরের প্রস্তুতি ম্যাচে বড় ধাক্কা খাওয়ার পর টেস্টে এমন ঘুরে দাঁড়ানো দলের মানসিক দৃঢ়তারও প্রমাণ দিয়েছে। চার দিনের মধ্যে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে বাংলাদেশ এখন দুই ম্যাচের সিরিজ জয়ের দোরগোড়ায়।
দুই দলের দ্বিতীয় টেস্ট অনুষ্ঠিত হবে ম্যাকেতে। সেখানে বাংলাদেশ সিরিজ জিততে চাইবে, আর অস্ট্রেলিয়া সিরিজে সমতা ফেরানোর লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামবে।
ডারউইনের এই জয় তাই শুধু একটি ম্যাচের ফল নয়। ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ফিরে এসে প্রথম টেস্টেই জয়, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্ট জয়, হাসান মাহমুদের ৯ উইকেট, মিরাজের ঐতিহাসিক পাঁচ উইকেট এবং ৯ উইকেটের বিশাল ব্যবধান মিলিয়ে দিনটি বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
দৃশ্যপট ডেস্ক
১৬ আগস্ট ২০২৬


