আমানত, বিনিয়োগ ও সম্পদে পিছিয়ে ইসলামি ব্যাংকগুলো

অর্থনীতি ডেস্ক: আর্থিক খাতের অস্থিতিশীলতা, বড় ধরনের ঋণ কেলেঙ্কারি, সুশাসনের ঘাটতি এবং ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার কারণে দেশের শরিয়াহভিত্তিক ইসলামি ব্যাংকগুলোর ব্যবসায়িক কার্যক্রমে মন্দা দেখা দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকাশিত একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, আমানত সংগ্রহ, বিনিয়োগ এবং মোট সম্পদ—এই তিন গুরুত্বপূর্ণ সূচকেই প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোর তুলনায় বেশ খানিকটা পিছিয়ে রয়েছে ইসলামি ব্যাংকগুলো। গত বছরগুলোতে ব্যাংক খাতের এই বিশেষ ধারায় আস্থার সংকট তৈরি হওয়ায় এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সামগ্রিক ব্যবসায়িক ফলাফলে। গ্রাহকদের আস্থাহীনতা এবং বিভিন্ন অনিয়মের খবরের জেরে এই শরিয়াহভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য হারে শ্লথ হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সময়সীমায় ইসলামি ব্যাংকগুলোর মোট আমানত সামান্য বৃদ্ধি পেয়ে নির্দিষ্ট অঙ্কে দাঁড়ালেও প্রবৃদ্ধির হার ছিল বেশ হতাশাজনক। যেখানে প্রচলিত ব্যাংকগুলোর আমানত দুই অংকের ঘরে বৃদ্ধি পেয়েছে, সেখানে ইসলামি ব্যাংকগুলোর আমানত বৃদ্ধির হার ছিল মাত্র তিন শতাংশের কাছাকাছি। একই চিত্র দেখা গেছে বিনিয়োগ ও সম্পদ বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও; প্রচলিত ব্যাংকগুলোর তুলনায় এই খাতে বিনিয়োগ এবং সম্পদ বৃদ্ধির হার প্রায় অর্ধেক। বর্তমানে দেশে ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংক ছাড়াও বেশ কিছু প্রচলিত ব্যাংক আলাদা শাখা ও উইন্ডোর মাধ্যমে শরিয়াহভিত্তিক সেবা দিয়ে আসছে। তবে সামগ্রিকভাবে পুরো খাতের ওপর আস্থার ঘাটতি থাকায় কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় তহবিল সংগ্রহ বা বিনিয়োগ করতে পারছে না ব্যাংকগুলো।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিগত বছরগুলোতে কিছু ব্যাংকে অনিয়ন্ত্রিত ও আগ্রাসী ঋণ বিতরণের প্রবণতা দেখা দিয়েছিল, যা পরবর্তী সময়ে বড় ধরনের কেলেঙ্কারির জন্ম দেয়। ২০২২ সালের দিকে কয়েকটি ইসলামি ব্যাংকে সংঘটিত আর্থিক অনিয়মের তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়তে থাকে। পরিস্থিতি সামাল দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে পর্যবেক্ষক নিয়োগ করে এবং পরবর্তীতে পাঁচটি ইসলামি ব্যাংককে একত্রিত করে একটি সম্মিলিত ব্যাংক গঠন করা হয়। এসব ঘটনার পর থেকেই আমানতকারীরা তাদের জমানো অর্থ তুলতে শুরু করেন কিংবা নতুন আমানত রাখার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করেন, যা পুরো খাতের স্বাভাবিক গতিশীলতাকে ব্যাহত করেছে।

বাণিজ্যিক কার্যক্রমেও ইসলামি ব্যাংকগুলোর পারফরম্যান্সে মিশ্র প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে, যেখানে রপ্তানি আয় কিছুটা কমলেও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের প্রবাহ সামান্য ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। তবে আমদানি দায় পরিশোধের চাপ এবং অভ্যন্তরীণ সংকটের কারণে এই খাতের ব্যাংকগুলোর কর্মী সংখ্যাও কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। এর মধ্যেও আশার আলো দেখাচ্ছে এজেন্ট ব্যাংকিং খাত, যেখানে মোট আমানতের প্রায় অর্ধেকই শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর দখলে রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করে, এই অবস্থান ধরে রাখতে এবং গ্রাহকদের হারানো আস্থা পুরোপুরি ফিরিয়ে আনতে ব্যাংকগুলোকে ডিজিটাল সেবার মান বাড়াতে হবে এবং নিজেদের নেটওয়ার্ক আরও বেশি বিস্তৃত করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *