খুঁটিতে বাঁধা বাবাকে চা-রুটি খাওয়ানো সেই শিশুর পড়াশোনার দায়িত্ব নিল প্রশাসন

চুরির অপবাদে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা বাবাকে নিজ হাতে চা-রুটি খাইয়ে দেওয়ার হৃদয়বিদারক দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর নড়েচড়ে বসেছে স্থানীয় প্রশাসন। বরিশালের উজিরপুর উপজেলার বামরাইল এলাকায় ঘটা এই ঘটনার ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর দেশজুড়ে তীব্র আলোচনার সৃষ্টি হয়। মূলত একজন মাদকাসক্ত বাবার করুণ পরিণতি এবং এক অবুঝ শিশুর নিঃশর্ত ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ সমাজবাসীর বিবেককে গভীরভাবে নাড়া দেয়। এই পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে হতদরিদ্র পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নেয় উপজেলা প্রশাসন।

ঘটনার সূত্রপাত গত ২৬ সেপ্টেম্বর ভোরে, যখন বামরাইল বাজারে চুরির অভিযোগে অনিক নামের এক ব্যক্তিকে আটক করে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে মারধর করেন স্থানীয়রা। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যায় তার নয় বছরের শিশুকন্যা এবং বাবাকে মারধর না করার জন্য আকুতি জানাতে থাকে। একপর্যায়ে ঘর থেকে চা ও রুটি এনে নিজ হাতে তা ভিজিয়ে বাবার মুখে তুলে দেয় শিশুটি। ব্যথায় কাতর বাবার শরীরের হাত বুলিয়ে তার যন্ত্রণার উপশম করার চেষ্টা করে সে। উপস্থিত লোকজনের সামনে ছোট্ট মেয়েটির এমন মায়াভরা দৃশ্যটি ক্যামেরাবন্দি হয়ে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়লে মুহূর্তের মধ্যে তা ভাইরাল হয়ে যায়।

ভাইরাল হওয়া ওই দৃশ্যটি প্রশাসনের নজরে আসার সঙ্গে সঙ্গে উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী সুজা দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তিনি নিজে ওই ব্যক্তির বাড়িতে গিয়ে পরিবারের খোঁজখবর নেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে মানবিক সহায়তা প্রদান করেন। পরবর্তীতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সহায়তায় অনিককে উন্নত চিকিৎসার জন্য একটি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। প্রশাসনের এই তড়িৎ পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

এদিকে অনিকের বিরুদ্ধে পূর্বে চুরির নানা অভিযোগ থাকলেও আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে এভাবে প্রকাশ্যে নির্যাতন করার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় থানা পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ না দেওয়ায় স্থানীয়ভাবে বিষয়টি মীমাংসা করা হয়েছিল। তবে অপরাধের ধরন যাই হোক না কেন, বিচারবহির্ভূত এমন কর্মকাণ্ডে একটি শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর যে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, বামরাইলের এই ঘটনা তা আবার স্পষ্ট করে তুলেছে।

বাবার চিকিৎসার পাশাপাশি ওই শিশুকন্যার ভবিষ্যৎ নিয়েও ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিশুটির লেখালেখির সম্পূর্ণ দায়িত্ব নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি দেখে দেশ-বিদেশ থেকে বহু হৃদয়বান ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান শিশুটিকে আর্থিক ও শিক্ষাসহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সব মিলিয়ে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া ছোট্ট এই মেয়েটির জীবনে এখন আশার আলো জ্বালানোর চেষ্টা চলছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *