গ্রামীণ ঋণে বাড়ছে কিস্তির চাপ

অর্থনীতি ডেস্ক: গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষের মধ্যে ঋণ নিয়ে সংসার পরিচালনার প্রবণতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ঋণ গ্রহণকারী গ্রামীণ পরিবারের হার আগের ৩৬ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ৪২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ঋণের এই বিস্তৃতির ফলে দরিদ্র পরিবারগুলোর ওপর কিস্তির চাপ অত্যন্ত মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রায় পুরো অংশই এখন ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে গিয়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে। পূর্বে এই হার তুলনামূলক কম থাকলেও বর্তমানে তা ৭৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতির নাজুক পরিস্থিতিরই নির্দেশ করে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষক কাজী ইকবালের পরিচালিত এক গবেষণায় গ্রামীণ ঋণবাজারের এই রূপান্তর চিত্রটি প্রকাশ পায়। সম্প্রতি আয়োজিত এক সংলাপে গবেষণার ফলাফলগুলো উপস্থাপন করা হয়, যেখানে গ্রামীণ অর্থায়ন এবং খাদ্য ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়। ওই অনুষ্ঠানে মূল গবেষণার পাশাপাশি কৃষি এসএমই অর্থায়ন, গবাদিপশু পালন এবং ভ্রাম্যমাণ খাদ্য বিক্রেতাদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সংক্রান্ত আরও কয়েকটি পৃথক প্রতিবেদনও তুলে ধরা হয়। এসব গবেষণায় গ্রামীণ জনপদের বিভিন্ন আর্থিক সংকট ও তার সম্ভাব্য কারণগুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সরাসরি কৃষকদের ঋণ না দিয়ে মূলত ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান বা এনজিওগুলোকে তহবিল যোগান দিচ্ছে। এর ফলে গ্রামীণ ঋণবাজারে সরাসরি ব্যাংকের ভূমিকা কমে গেছে এবং মানুষ চড়া সুদের এনজিও ঋণের ওপর বেশি মাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। বর্তমানে গ্রামের প্রতি চারটি ঋণের তিনটিই আসছে বিভিন্ন এনজিও ও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান থেকে। ব্যাংকঋণের সুদহার তুলনামূলক কম হলেও এনজিওর ক্ষেত্রে ফ্ল্যাট সুদের হার ১৫ শতাংশ বলা হলেও কার্যকর সুদের হার প্রায় ২৭ শতাংশে গিয়ে দাঁড়ায়। এছাড়া মহাজনি ঋণের উচ্চ সুদহার তো রয়েছেই, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক দীর্ঘমেয়াদি ও অসম প্রতিযোগিতাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।

ঋণের পরিমাণ সামগ্রিকভাবে বৃদ্ধি পেলেও কৃষিখাতে এর সুনির্দিষ্ট অংশ কমে ১৬ শতাংশে নেমে এসেছে। কৃষকরা মূলত সার, বীজ কেনার পাশাপাশি জমি ইজারা নেওয়া ও গবাদিপশু পালনে এই অর্থ ব্যয় করে থাকেন। তবে ঋণের কিস্তি পরিশোধের বর্তমান ব্যবস্থাটি কৃষকদের জন্য বড় ধরনের দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাপ্তাহিক বা মাসিক কিস্তির নিয়ম থাকার কারণে ফসল ঘরে তোলার বা বিক্রির আগেই কৃষকদের কিস্তির টাকা শোধ করতে হয়। এর ফলে অনেককেই বাধ্য হয়ে অন্য উৎস থেকে চড়া সুদে অর্থ সংগ্রহ করে কিস্তি মেটাতে হয়, যা তাদের ঋণের দুষ্টচক্রে আরও গভীরভাবে আটকে ফেলছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *