ছবি ও ভিডিওতে এআই মডেলের প্রভাব, যেভাবে ঝুঁকিতে পড়তে পারে তরুণদের মনস্তত্ত্ব

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিজ্ঞাপনের দুনিয়ায় দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি মানুষের ছবি ও ভিডিও। প্রযুক্তির এই ব্যাপক প্রসার সৃজনশীল ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি করলেও এর কিছু নেতিবাচক দিক নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মনোবিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে অনলাইনে থাকা নিখুঁত ও অবাস্তব এসব রূপের মানদণ্ড তরুণদের মনে নিজেদের শরীর নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বেগ ও হীনম্মন্যতা তৈরি করছে। অনেকেই বাস্তবসম্মত নয় এমন শারীরিক গঠনের পেছনে ছুটে মানসিক সংকটে পড়ছেন, যা বর্তমান সময়ের একটি বড় সংকট হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

মানসিক স্বাস্থ্য সংকট থেকে ঘুরে দাঁড়ানো মিয়া পেরুমাল নামের এক শিক্ষার্থী সম্প্রতি তার উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। তিনি লক্ষ করেছেন, অনলাইনে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও কৃত্রিমভাবে তৈরি মানুষের ছবির নিচে কমবয়সী কিশোরীদের কাছ থেকেও নানা ধরনের অবাস্তব মন্তব্য আসছে। এ ধরনের ছবির বাহ্যিক রূপ বাস্তবে অর্জন করা প্রায় অসম্ভব হলেও তরুণ প্রজন্মের অবচেতন মনে এটি গভীর প্রভাব ফেলছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, খাওয়া-দাওয়া সংক্রান্ত মানসিক জটিলতায় ভোগা ব্যক্তিরা সবসময় যৌক্তিকভাবে সবকিছু বিবেচনা করতে পারেন না। ফলে ডিজিটাল মাধ্যমে প্রদর্শিত যেকোনো বিষয়কে অন্ধভাবে বিশ্বাস না করে বরং সেগুলোকে প্রশ্ন করার মানসিকতা তৈরি করা জরুরি।

অভিভাবকদের অনেকেও তাদের সন্তানদের মানসিক সুরক্ষা নিয়ে যথেষ্ট শঙ্কিত রয়েছেন। কেলি ওয়াটস নামের এক অভিভাবক জানান, তিনি কিশোর বয়সে ম্যাগাজিনের মডেলদের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করতেন, কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের শিশুরা ইউটিউব বা অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে আরও নিখুঁত এআই চরিত্রের মুখোমুখি হচ্ছে। অনেক সময় বিজ্ঞাপনে ব্যবহৃত এসব ছবি কৃত্রিম কি না তা আলাদা করাও কঠিন হয়ে পড়ে, যা শিশুদের মনে অবাস্তব প্রত্যাশা তৈরি করে। কোনো মানুষই নিখুঁত হতে পারে না—এই বাস্তবতা না বুঝে শিশুরা যদি নিজেদের ত্রুটিহীনমাণের মাপকাঠিতে মেপে চলে, তবে তাদের আত্মবিশ্বাস মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

ব্রিস্টলের সেন্টার ফর অ্যাপিয়ারেন্স রিসার্চের অধ্যাপক ফিলিপ্পা ডিডরিখস ব্যাখ্যা করেন যে, মানুষের মধ্যে অন্যের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করার সহজাত প্রবৃত্তি রয়েছে। তবে এই তুলনার ভিত্তি যদি এমন কোনো কৃত্রিম মানদণ্ড হয় যা বাস্তব জীবনে অস্তিত্বহীন, তবে তা আত্মসম্মানবোধ কমিয়ে দেয়। এআই প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার বৈচিত্র্য ফুটিয়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে, তবে সচেতনভাবে নির্দেশনা না দিলে এটি সমাজের প্রচলিত ও সংকীর্ণ সৌন্দর্যের ধারণাকেই কেবল টিকিয়ে রাখবে। এতে বর্ণ, লিঙ্গ কিংবা শারীরিক বৈশিষ্ট্যের বৈচিত্র্য উপেক্ষিত হওয়ার বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়।

প্রযুক্তির এই আগ্রাসন থেকে রক্ষা পেতে এবং ইতিবাচক মানসিকতা বজায় রাখতে ভোক্তাদের আরও সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন গবেষকরা। কোনো কনটেন্ট বা বিজ্ঞাপন দেখার পর নিজের কাছে প্রশ্ন করা উচিত যে এটি মনে প্রশান্তি আনছে নাকি হীনম্মন্যতা বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে বিপণন সংস্থাগুলো যেন মানুষের সৃজনশীলতাকে পুরোপুরি গ্রাস না করে এবং কৃত্রিম মডেলের পাশাপাশি বাস্তব মানুষের অভিজ্ঞতাকে যথাযথ মূল্যায়ন করে, সে বিষয়েও সোচ্চার হতে হবে। ব্র্যান্ডগুলো যেন এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে, সেজন্য ভোক্তারা তাদের মতামত ও প্রতিক্রিয়া জানাতে পারেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *