জাতীয় ডেস্ক: আসন্ন পূজার ছুটিকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের যাতায়াত সহজ করতে ট্রেনের টিকিটের চাহিদা সবসময়ই শীর্ষে থাকে। তবে প্রতিবারের মতো এবারও অনেকেই কাঙ্ক্ষিত টিকিট না পেয়ে হতাশ হচ্ছেন এবং মনে প্রশ্ন জাগছে যে আসলেই আসন কম নাকি এর পেছনে অন্য কোনো গলদ রয়েছে। সম্প্রতি পরিবহন অডিট অধিদপ্তরের এক আইটি অডিট প্রতিবেদনে রেলের অনলাইন টিকিটিং ব্যবস্থাপনায় ২২ ধরনের গুরুতর অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। এসব আপত্তির মধ্যে সাধারণ যাত্রীদের জন্য টিকিট সহজলভ্য না হওয়ার নেপথ্য কারণ ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাগুলো স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যদিও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ রয়েছে, তবে ছুটির এই সময়ে জনস্বার্থে বিষয়গুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
অডিটের তথ্য অনুযায়ী, বিশেষ ড্যাশবোর্ড ব্যবহার করে সাধারণ যাত্রীদের জন্য টিকিট উন্মুক্ত করার অন্তত এক থেকে পাঁচ দিন আগেই তা আটকে রাখার সুযোগ রাখা হয়েছে। এছাড়া স্টেশনের ভেন্ডর প্রতিনিধি এবং রেলওয়ের বুকিং সহকর্মীদের যোগসাজশে বিভিন্ন রুটের টিকিট কালোবাজারে চলে যাওয়ার মতো গুরুতর ফাঁকফোকরও রয়ে গেছে। চুক্তি অনুযায়ী ভেন্ডর প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা কেবল কারিগরি ও নেটওয়ার্ক রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকার কথা থাকলেও শতাধিক স্টেশনের অ্যাডমিন অ্যাকাউন্ট তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ফলে রাজশাহী, খুলনা, সিলেট কিংবা চট্টগ্রাম—সব রুটের যাত্রীরাই এই অস্বচ্ছ ও ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থার কারণে সমানভাবে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
অনলাইন টিকিটিং নিয়ে এই ধরনের সংকট নতুন নয় এবং এর আগে ২০২২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর আন্দোলনের মাধ্যমে বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচনায় এসেছিল। ওই সময় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর অনিয়মের সত্যতা পেলেও পরবর্তীতে আইনি প্রক্রিয়ায় তার সুরাহা হয়নি। বর্তমান অডিট প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে যে, সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান প্রতি টিকিটে খুবই সামান্য কমিশন পেলেও আসন আটকে রাখার সুযোগ থাকায় সেখানে বড় ধরনের অনিয়মের ঝুঁকি তৈরি হয়। চুক্তি অনুযায়ী নিয়ম লঙ্ঘনের জন্য জরিমানার বিধান থাকলেও বাস্তবে তা কার্যকর করা হয়নি, যার ফলে রাজস্ব ক্ষতি এবং ভ্যাটের ঘাটতিও তৈরি হয়েছে। এছাড়া প্রায় আড়াই কোটিরও বেশি যাত্রীর সংবেদনশীল তথ্য প্রশাসনিক অনুমোদন ছাড়া বিদেশে ক্লাউডে সংরক্ষণ করায় নিরাপত্তা ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।
ছুটির মৌসুমে যাত্রীদের দুর্ভোগ কমাতে এবং টিকিটিং ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরাতে অবিলম্বে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। লাইভ সার্ভারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ভেন্ডরের হাত থেকে ফিরিয়ে এনে রেলওয়ের নিজস্ব দায়িত্বশীল কর্মীদের হাতে ন্যস্ত করা উচিত। কোনো আসন আটকে রাখতে হলে সুনির্দিষ্ট কারণ ও উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমোদন নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে এবং নির্দিষ্ট সময় পর তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে উন্মুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে যাত্রীদের ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে কঠোর নজরদারি এবং প্রযুক্তিগত সংস্কার অত্যন্ত প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদে ডেটা নিরাপত্তা জোরদার এবং চুক্তি অনুযায়ী জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল রেলের টিকিটিং ব্যবস্থায় জনআস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।


