নিখোঁজের ২৫ দিন পর জঙ্গলে মিললো রাশেদুলের কঙ্কাল, গ্রেফতার ৩

ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলায় দীর্ঘ প্রায় এক মাস নিখোঁজ থাকার পর রাশেদুল ইসলাম নামের এক তরুণের মাথার খুলিসহ শরীরের বিভিন্ন হাড়ের কঙ্কাল উদ্ধার করেছে পুলিশ। স্থানীয় চন্দ্রপুর গ্রামের গারোর ভিটা এলাকার একটি জঙ্গল থেকে ওই তরুণের কঙ্কাল ছাড়াও তার পরিহিত প্যান্ট ও গেঞ্জি জব্দ করা হয়। পরবর্তীতে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া পোশাকগুলো দেখে কঙ্কালটি নিখোঁজ রাশেদুলের বলেই নিশ্চিত করেন তার পরিবার। নিহতের বাবা মো. শাহজাহানের সঙ্গে ইটভাটায় শ্রমিকের কাজ করতেন ১৯ বছর বয়সী রাশেদুল, যিনি কর্মহীন থাকার সময় স্থানীয় কিছু যুবকের সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত শুরু করেছিলেন। হত্যাকাণ্ডের শিকার রাশেদুল ফুলপুর উপজেলার কৃষ্ণ মহেশপট্টি গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন এবং তার আকস্মিক এমন পরিণতিতে পুরো এলাকায় শোকের পাশাপাশি চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। পুলিশ এই ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে অভিযান চালিয়ে তিনজনকে আটক করতে সক্ষম হয়েছে এবং ঘটনার নেপথ্যের রহস্য উন্মোচনে তদন্ত কার্যক্রম জোরদার করেছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া হাড় ও অন্যান্য আলামত ফরেনসিক পরীক্ষা এবং ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হবে।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য ও পুলিশি সূত্রে জানা যায়, গত ১২ আগস্ট রাতে মোবাইল ফোনে কল পেয়ে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর থেকেই রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন তরুণ রাশেদুল। বাড়ি থেকে বের হওয়ার পরপরই একটি অজ্ঞাত নম্বর থেকে তার বাবার ফোনে কল আসে এবং এক নারীর কণ্ঠস্বর ব্যবহার করে ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেই টাকা পরিশোধের জন্য বারবার চাপ সৃষ্টি করা হলেও পরবর্তীতে তার কোনো সন্ধান মেলেনি। এ ঘটনায় নিহতের বাবা তাৎক্ষণিকভাবে ফুলপুর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন এবং পরবর্তীতে কোনো উপায় না পেয়ে প্রধান অভিযুক্ত জসিম উদ্দিনকে নামীয় এবং আরও কয়েকজনকে অজ্ঞাত আসামি করে একটি অপহরণ মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পর থেকেই প্রধান অভিযুক্ত জসিম এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও পুলিশের নজরদারির কারণে শেষ রক্ষা হয়নি। প্রযুক্তি ও তথ্যের সহায়তায় পুলিশ নেত্রকোনার শ্যামগঞ্জ রেলস্টেশন এলাকা থেকে প্রধান অভিযুক্ত জসিমকে গ্রেফতার করতে সমর্থ হয় এবং তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অন্য সহযোগীদেরও জালে টানে।

গ্রেফতারকৃত অপর দুই ব্যক্তি হলেন রফিক ও মোজাম্মেল হোসেন, যাদেরকে জসিমের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাদের নিজ এলাকা থেকেই আটক করা হয়। আটককৃতদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ জানতে পেরেছে যে, নিখোঁজ রাশেদুলকে শ্বাসরোধ করেই হত্যা করা হয়েছিল, যদিও অপরাধের সুনির্দিষ্ট কারণ নিয়ে তাদের বক্তব্যে নানা অসঙ্গতি ও লুকোচুরি লক্ষ্য করা গেছে। নিহত তরুণের পরিবারের অভিযোগ, হত্যাকাণ্ডের কয়েক দিন আগে একটি শসাক্ষেতে শ্রমিক হিসেবে কাজ করার সময় পাওনা টাকা নিয়ে রফিকের সঙ্গে রাশেদুলের বিরোধ তৈরি হয়েছিল। পারিশ্রমিকের সেই টাকা নিয়ে বাকবিতণ্ডার জেরে এবং মাদক সেবন সংক্রান্ত কোনো দ্বন্দ্বের কারণেই এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে বলে জোরালো সন্দেহ প্রকাশ করেছেন নিহতের বাবা শাহজাহান। পুলিশ জানিয়েছে, আসামিরা জিজ্ঞাসাবাদে একেক সময় একেক ধরনের তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে, যার ফলে অপরাধের প্রকৃত মোটিভ বা কারণ নিশ্চিত করতে আরও গভীরভাবে তদন্ত পরিচালনা করা হচ্ছে।

ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে গ্রেফতারকৃত তিন অভিযুক্তকে কঠোর জিজ্ঞাসাবাদের পর আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দ্রুত আদালতে সোপর্দ করার প্রস্তুতি চলছে বলে নিশ্চিত করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও ফুলপুর থানার উপপরিদর্শক জিকরুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান যে, আসামিদের বয়ানে ভিন্নতা থাকায় হত্যাকাণ্ডের পেছনের মূল কারণ এখনই চূড়ান্তভাবে বলা সম্ভব হচ্ছে না। তবে পুলিশের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, পূর্বপরিকল্পিতভাবে বা কোনো ক্ষুদ্র বিরোধের জেরে তরুণ রাশেদুলকে ডেকে নিয়ে নিঃশেষ করা হয়ে থাকতে পারে। উদ্ধারকৃত কঙ্কালের ডিএনএ পরীক্ষা সম্পন্ন হলে হত্যাকাণ্ডের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ এবং অপরাধের সঙ্গে জড়িত অন্যান্যদের প্রকৃত ভূমিকা আরও স্পষ্টভাবে উন্মোচিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার এবং নেপথ্যের সব কুশীলবকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী ও নিহতের পরিবার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *