পায়ে মাড়িয়ে চানাচুর তৈরি, তেলাপোকা-ছারপোকার বিচরণ

জনসাধারণের স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং মানসম্মত খাদ্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দেশজুড়ে কঠোর নজরদারি ও অভিযান পরিচালনা করছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। সাম্প্রতিক সময়ে পরিচালিত এসব বিশেষ কার্যক্রমে দেশের বিভিন্ন খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও রেস্তোরাঁয় মারাত্মক অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্ট আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট এবং বিশেষ ট্রায়াল পরিচালনা করা হচ্ছে। নিরাপদ খাদ্য আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে যারা সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে খেলছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের অংশ হিসেবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে মোটা অঙ্কের আর্থিক জরিমানা করা হয়েছে।

চলতি মাসের নির্দিষ্ট কয়েকটি সপ্তাহে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের লক্ষ্মীপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, গাজীপুর, ফরিদপুর, কিশোরগঞ্জ, মৌলভিবাজার, হবিগঞ্জ, সিলেট, বরিশাল, রংপুর ও নীলফামারি জেলার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালানো হয়। এসব অভিযানে অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশে খাদ্যপণ্য তৈরির ভয়ংকর চিত্র দেখতে পান ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচারকরা। কোথাও দেখা গেছে পায়ে মাড়িয়ে চানাচুর প্রস্তুত করা হচ্ছে, আবার কোথাও উৎপাদন কেন্দ্রের ভেতরে অবাধে তেলাপোকা ও ছারপোকার মতো ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ ঘুরে বেড়াচ্ছে। এছাড়া পোড়া তেল ও অননুমোদিত রাসায়নিক রং ব্যবহারের পাশাপাশি খাদ্যপণ্যে ক্ষতিকর উপাদান মেশানোর অপরাধে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানকে হাতেনাতে ধরা হয়েছে। প্রয়োজনীয় নিবন্ধন ছাড়াই অবৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা এবং পণ্যের গায়ে সঠিক লেবেল বা উৎপাদন ও মেয়াদের তারিখ না থাকার কারণেও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

আইন প্রয়োগের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিচারিক কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে যার অংশ হিসেবে বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতের বিচারক ও ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পরিচালিত ট্রায়ালে বহু প্রতিষ্ঠানকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। বিশেষ করে পাবনা ও সিলেটের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পরিচালিত অভিযানে খাদ্য প্রস্তুত ও সংরক্ষণের ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক ত্রুটি ধরা পড়ে। অনেক প্রতিষ্ঠানকে তাৎক্ষণিকভাবে বড় অংকের জরিমানা করা হয়েছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ত্রুটি সংশোধন করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণেই সীমাবদ্ধ না থেকে, হোটেল-রেস্তোরাঁ, বেকারি এবং মিষ্টির দোকানসহ প্রায় দুই শতাধিক খাদ্যস্থাপনায় নিয়মিত মনিটরিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। উৎপাদক থেকে শুরু করে বিপণন পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে নিরাপদ খাদ্য বিধিমালা যথাযথভাবে মানা হচ্ছে কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখছেন সংশ্লিষ্ট পরিদর্শকরা।

খাদ্য নিরাপত্তা কেবল প্রশাসনিক নজরদারির বিষয় নয়, বরং এর জন্য প্রয়োজন সর্বস্তরের গণসচেতনতা এবং সামাজিক আন্দোলন। এই উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে গণমাধ্যমে বহুমুখী প্রচারণামূলক কার্যক্রম নিয়মিত সম্প্রচার করা হচ্ছে। সরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ও বাংলাদেশ বেতারে সচেতনতামূলক অডিও বার্তা এবং স্ক্রলবার্তা প্রচারের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নিয়মিত প্রচার চালানো হচ্ছে যাতে ভোক্তারা তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে পারেন। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন যে, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এই কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং তা ভবিষ্যতেও আরও কঠোরভাবে অব্যাহত থাকবে। নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত জাতি গঠনে সরকারের পাশাপাশি ব্যবসায়ী, উৎপাদক এবং সচেতন ভোক্তাদের সম্মিলিত সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি বলে তিনি মনে করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *