বিয়ের ১৪ দিন আগে ডেঙ্গুতে মৃত্যু, নিথর কপালে সিঁদুর পরালেন হবু বর

আসন্ন বিয়ের আনন্দঘন পরিবেশ মুহূর্তে রূপ নিয়েছে গভীর শোকে। গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া উপজেলার নৈয়ার বাড়ি গ্রামে শুরু হয়েছে শোকের মাতম। কিছুদিন আগেও যে বাড়িতে দুই জমজ বোনের বিয়ে ও শারদীয় দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে উৎসবের প্রস্তুতি চলছিল, সেখানে এখন কেবলই কান্নার রোল। সবার অজান্তে ডেঙ্গু কেড়ে নিয়েছে ২৫ বছর বয়সী তরুণী বৃষ্টি ঘরামীর প্রাণ। তিনি ঢাকার শ্যামলীর ট্রমা সেন্টারে সিনিয়র স্টাফ নার্স হিসেবে কর্মরত ছিলেন। হঠাৎ জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার পর শারীরিক পরীক্ষার মাধ্যমে তাঁর শরীরে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। পরবর্তীতে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর আগে রক্তের প্রয়োজন জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্টও করেছিলেন এই তরুণী নার্স। তাঁর এমন আকস্মিক প্রয়াণে পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও পুরো এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত ১৬ অক্টোবর একই দিনে জমজ দুই বোন বৃষ্টি ও বন্যা ঘরামীর বিয়ের দিন নির্ধারিত ছিল। বৃষ্টির হবু স্বামী ছিলেন মুকসুদপুর উপজেলার গোয়াইল গ্রামের বাসিন্দা সবুজ মণ্ডল। দুই বোনের বিয়ে ঘিরে পরিবারে ব্যাপক আনন্দ ও উদ্দীপনা বিরাজ করছিল। বিয়ের লাল শাড়ি, সিঁদুর থেকে শুরু করে কনের সাজসজ্জার সব কেনাকাটাও প্রায় সম্পন্ন হয়েছিল। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে হবু শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার পরিবর্তে বাবা নির্মল ঘরামিকে মেয়েকে হারাতে হয়েছে। মৃত কন্যার মরদেহ বাড়িতে নিয়ে আসার সময় বরপক্ষের লোকজন বিয়ের জন্য কেনা লাল বেনারসি শাড়ি ও সিঁদুর সঙ্গে নিয়ে আসেন। পরে সবার উপস্থিতিতে বৃষ্টির নিথর কপালে সিঁদুর পরিয়ে তাঁকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেন হবু বর সবুজ মণ্ডল। এরপর কোটালীপাড়ার নিজ বাড়িতেই তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বৃষ্টি অত্যন্ত মেধাবী, পরিশ্রমী এবং হাসিখুশি স্বভাবের মেয়ে ছিলেন। তিনি ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে গোপালগঞ্জ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কলেজে পড়াশোনা শেষ করেছিলেন। পরিবারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন এই তরুণী। নিজের বিয়ের খরচ জোগাতে এবং পুরো পরিবারকে আর্থিকভাবে সহযোগিতা করতে তিনি কর্মক্ষেত্রে অতিরিক্ত ডিউটি করতেন। তাঁর জমজ বোন বন্যা ঘরামীও ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নার্স হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। ছোটবেলা থেকেই দুই বোনের মধ্যে অত্যন্ত গভীর ও আত্মিক সম্পর্ক ছিল। বৃষ্টির এই আকস্মিক মৃত্যুতে তাঁর জমজ বোন বন্যা মানসিকভাবে মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়েছেন।

প্রতিবেশী ও শিক্ষকরা জানিয়েছেন, বৃষ্টির মতো একজন সম্ভাবনাময় তরুণীর এমন মৃত্যু মেনে নেওয়া কঠিন। ছোটবেলা থেকেই তিনি অত্যন্ত নম্র ও গুণী ছিলেন। তাঁর সহকর্মী ও স্বজনদের হৃদয়বিদারক স্মৃতিচারণায় উঠে এসেছে বৃষ্টির সংগ্রামের নানা দিক। যে বাড়িতে কয়েক দিন পর সানাইয়ের সুর বাজার কথা ছিল, সেখানে এখন কেবলই হাহাকার। বিয়ের জন্য কেনা লাল শাড়ি আর সিঁদুরগুলো অক্ষত পড়ে থাকলেও পৃথিবীতে নেই বৃষ্টি। এই অকালমৃত্যু পরিবারটির সমস্ত স্বপ্নকে চিরতরে স্তব্ধ করে দিয়েছে, যা দীর্ঘকাল এলাকাবাসীকে কাঁদাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *