প্রযুক্তি ডেস্ক: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের অভূতপূর্ব অগ্রগতি মানুষের জীবনযাত্রা, শিক্ষাগ্রহণ এবং চিন্তাধারায় গভীর পরিবর্তন আনছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই প্রযুক্তির পরিধি ও কার্যক্ষমতা এতটাই বেড়েছে যে এটি কেবল সাধারণ কাজ নয়, বরং জটিল সমস্যার সমাধানেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে প্রযুক্তির এই দ্রুত প্রসারের ফলে মানুষের নিজস্ব মেধা ও দক্ষতার ওপর নির্ভরতা কমে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। এআই নীতিবিদ ও দার্শনিক হেনরি শেভলিন তাঁর সাম্প্রতিক এক নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন যে, এই নতুন বুদ্ধিমত্তা মানবজাতির অভিজ্ঞতায় এক অভিনব রূপান্তর ঘটাচ্ছে।
শিক্ষা ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় দিকই রয়েছে। নাইজেরিয়ার একটি গবেষণায় দেখা গেছে, জেনারেটিভ এআইভিত্তিক শিক্ষকের সহায়তা নিয়ে শিক্ষার্থীরা স্বল্প সময়ে অভাবনীয় অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে তুরস্কের একটি গবেষণায় ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে, যেখানে দেখা গেছে যে শিক্ষার্থীরা সরাসরি জিপিটি-৪ ব্যবহার করে প্রাথমিক সুফল পেলেও, পরবর্তীতে বই ছাড়া পরীক্ষায় তারা পিছিয়ে পড়েছিল। এর কারণ হলো প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা শিক্ষার্থীদের নিজেদের স্বাধীনভাবে চিন্তা করার ক্ষমতাকে খর্ব করতে পারে।
সৃজনশীলতার জগতেও এআইয়ের প্রভাব নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। লেখকদের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় তৈরি করা লেখার মান অনেক সময় উন্নত মনে হলেও এর ফলে সামগ্রিক সৃষ্টিশীলতায় বৈচিত্র্য কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। অর্থাৎ, প্রযুক্তি মানুষের চিন্তার পরিধি বাড়াতে সাহায্য করলেও একই ধরনের ধারায় অভ্যস্ত করে তোলার মাধ্যমে বৈচিত্র্য নষ্ট করতে পারে। তবে মানুষের নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ইতিহাস বেশ পুরোনো এবং এটি নতুন কোনো ঘটনা নয়।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, লেখার প্রচলন বা কৃষিকাজের সূচনার মতো যুগান্তকারী আবিষ্কারগুলোও মানুষের মস্তিষ্কের ব্যবহার এবং জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন এনেছিল। প্রাচীনকালে দার্শনিক প্লেটো লেখার আবিষ্কার নিয়ে স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করলেও শেষ পর্যন্ত লেখা মানুষের জ্ঞান সংরক্ষণের মাধ্যমেই বিকশিত হয়েছে। দার্শনিক অ্যান্ডি ক্লার্কের মতে, মানুষ বরাবরই বাইরের উপকরণ ও প্রযুক্তির সাহায্যে নিজের সক্ষমতা বাড়িয়ে এসেছে এবং এটি মানব প্রজাতির একটি সহজাত বৈশিষ্ট্য।
ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের জন্য কতটা কল্যাণকর বা ক্ষতিকর হবে, তা মূলত নির্ভর করবে এর সঠিক নকশা ও ব্যবহারের ওপর। গবেষণায় দেখা গেছে, সরাসরি উত্তর না দিয়ে শিক্ষার্থীকে নিজে সমাধান খুঁজতে সহায়তা করে এমন এআই অনেক বেশি সুফল বয়ে আনে। তাই মানবজাতি প্রযুক্তির এই নতুন যুগে প্রবেশ করার সময় কতটা সচেতনভাবে তা ব্যবহার করছে, সেটাই নির্ধারণ করবে এর চূড়ান্ত পরিণতির দিকটি।


