সম্পত্তি হস্তান্তরের নতুন আইন নিয়ে কেন এত ‘বিরোধিতা’

জাতীয় সংসদে সম্প্রতি পাস হওয়া ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ নিয়ে আইন অঙ্গন ও রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা ও বিতর্ক শুরু হয়েছে। ১৮৮২ সালের পুরনো সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে নতুন দুটি ধারা যুক্ত করে এই বিধান আনা হয়েছে, যার মূল উদ্দেশ্য হলো নির্দিষ্ট সম্পর্কের মানুষের মধ্যে সম্পত্তি দান করার পরও দাতার জীবদ্দশায় ওই সম্পত্তি ভোগ ও ব্যবহারের অধিকার নিশ্চিত করা। এর ফলে এখন থেকে বাবা-মা, সন্তান, দাদা-দাদি, নাতি-নাতনি কিংবা স্বামী-স্ত্রীর মতো নিকটাত্মীয়দের মধ্যে সম্পত্তি হস্তান্তর করলেও দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত নিজের বসতবাড়ি বা জমি ব্যবহার করার আইনি সুরক্ষা পাবেন। তবে বিলটি পাস হওয়ার পরপরই এর কার্যকারিতা ও ধর্মীয় উত্তরাধিকার আইনের সঙ্গে এর সম্ভাব্য সংঘাত নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

নতুন এই আইনে ১২২এ ও ১২২বি ধারা যুক্ত করার মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় একটি বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। এতদিন সম্পত্তি দান করলে তার সম্পূর্ণ মালিকানা ও ভোগাধিকার দুটোই গ্রহীতার কাছে চলে যেত, যার ফলে অনেক সময় বৃদ্ধ মা-বাবারা সন্তানকে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পর চরম অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়তেন। সংশোধিত বিধান অনুযায়ী, এখন স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে মালিকানা ও জীবনকালীন ভোগাধিকারকে আলাদা করে রাখার সুযোগ তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ, দাতা সম্পত্তি আইনগতভাবে অন্যের নামে লিখে দিলেও তিনি জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তি নিজে ভোগ করতে পারবেন এবং গ্রহীতা দাতার আগে মারা গেলেও দাতার সেই ভোগাধিকার ক্ষুণ্ন হবে না। এছাড়া নিবন্ধনের পর এই ধরনের দান সাধারণত একতরফাভাবে বাতিল করা যায় না, তবে উভয়ের সম্মতিতে বা জটিল পরিস্থিতিতে আদালতের মাধ্যমে তা মীমাংসার সুযোগ রাখা হয়েছে।

তবে এই আইন প্রণয়নের পরই জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন ইসলামী দল ও শরিয়াহ বিশেষজ্ঞরা এর তীব্র বিরোধিতা করেছন এবং এর সঙ্গে ইসলামের উত্তরাধিকার বা ফারায়েজ এবং হেবার বিধানের কোনো সংঘাত তৈরি হয় কি না, তা নিয়ে জোরালো প্রশ্ন তুলেছেন। বিরোধীদলীয় নেতাদের মতে, মানবিক দিক থেকে বৃদ্ধ মা-বাবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি হলেও, তা যেন মুসলিম শরিয়াহর হেবা, অসিয়ত ও উত্তরাধিকার আইনকে পাশ কাটিয়ে না যায়। আইন পাসের আগে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বা দেশের বিশিষ্ট শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদের মতামত না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তারা আইনটির বিভিন্ন ধারা পুনর্বিবেচনা করার দাবি জানিয়েছেন। বিশেষ করে, দাতা জীবিত থাকা অবস্থায় ভোগাধিকার নিজের কাছে রেখে মালিকানা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে শরিয়াহসম্মত ‘কবয’ বা প্রকৃত হস্তান্তরের বিষয়টি কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন তারা।

অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে জানানো হয়েছে যে, এই নতুন ব্যবস্থাটি মুসলিমদের প্রচলিত ‘হেবা’ বা অন্য কোনো স্বীকৃত দানপদ্ধতির বিকল্প নয়, বরং এটি একটি সম্পূর্ণ পৃথক ও নিরপেক্ষ আইনগত প্রক্রিয়া। নতুন আইনের ১২২এ(৪) উপধারায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই সংশোধনী প্রচলিত কোনো দান বা হেবা পদ্ধতির বৈধতাকে ক্ষুণ্ন করবে না এবং এটি সব ধর্মের মানুষের জন্যই প্রযোজ্য হবে। সরকারের যুক্তি হলো, এটি নির্দিষ্ট কোনো ধর্মীয় আইন নয়, বরং সর্বসাধারণের সম্পত্তি হস্তান্তরের সাধারণ কাঠামোর একটি আধুনিক সংযোজন, যা বিশেষ করে প্রবীণ ব্যক্তিদের অধিকার রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে আইনি এই নতুন ব্যবস্থার বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের সঙ্গে এর কোনো জটিলতা তৈরি হয় কি না এবং ভবিষ্যৎ পারিবারিক বিরোধ এড়াতে এর সঠিক সুরাহা কীভাবে হয়, তা সময়ই বলে দেবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *