অর্থনীতি ডেস্ক: দেশের ব্যাংকিং খাতে করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর কার্যক্রমে বড় ধরনের ভাটা লক্ষ্য করা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স বিভাগের প্রকাশিত সাম্প্রতিক ষাণ্মাসিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, চলতি বছরের প্রথমার্ধে এই খাতের ব্যয় আগের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ কমে গেছে। মূলত পরিবেশ, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য—এই তিনটি প্রধান খাতেই বিনিয়োগের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি হ্রাস পেয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যাংকগুলো তাদের মুনাফা ও কার্যক্রমের একটি নির্দিষ্ট অংশ সমাজকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করার কথা থাকলেও বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এর চিত্র কিছুটা পাল্টে গেছে। সার্বিক এই পতনের ফলে সামগ্রিক সমাজকল্যাণমূলক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকগুলোর মোট সিএসআর ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১৯ কোটি চার লাখ টাকা। অথচ এর আগের ছয় মাসে এই খাতের ব্যয় ছিল ১৯৭ কোটি ৮৫ লাখ টাকা, যার অর্থ দাঁড়ায় এক বছরের ব্যবধানে এই খাতে প্রায় ৭৮ কোটি ৮১ লাখ টাকা বা প্রায় ৩৯ দশমিক ৮ শতাংশ ব্যয় কমেছে। বিশেষ করে পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রশমন এবং অভিযোজন কার্যক্রমে সবচেয়ে বেশি সংকোচন ঘটেছে, যা আগের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এছাড়া শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য খাতেও যথাক্রমে প্রায় ৪৫ ও ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বরাদ্দ কমিয়েছে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। তবে এসব প্রধান খাতের বাইরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য উপখাতে ব্যয় সামান্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংক খাতের এই সংকোচনমূলক প্রবণতার পেছনে অন্যতম প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে খেলাপি ঋণের লাগামহীন বৃদ্ধি। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ রেকর্ড পরিমাণে বেড়ে যাওয়ার কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফা অর্জনে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়মানুযায়ী কোনো ব্যাংক নিট লোকসানে থাকলে তারা সিএসআর খাতে অর্থ ব্যয় করতে পারে না এবং সার্বিক মুনাফা কমে যাওয়ায় অনেক ব্যাংকই তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতার বাজেট কমাতে বাধ্য হয়েছে। ব্যাংকগুলোর ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোই সিএসআর ব্যয়ের সিংহভাগ বহন করেছে, যেখানে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর অবদান তুলনামূলকভাবে বেশ কম ছিল।
এদিকে সামগ্রিক পতন সত্ত্বেও কিছু ব্যাংক তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা বজায় রাখতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সিএসআর ব্যয়ে শীর্ষে অবস্থান করছে ঢাকা ব্যাংক, যারা প্রায় সাড়ে ১২ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকসহ শীর্ষ দশটি ব্যাংকের তালিকায় আরও রয়েছে শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক এবং মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক। তবে সামগ্রিক খাতের এই মন্দাবস্থা কাটিয়ে উঠতে এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যাংকিং খাতের আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা।


