মুখে কালো কাপড় বেঁধে সংসদ ভবন থেকে বেরিয়ে গেল বিরোধীদল

সম্প্রতি জাতীয় সংসদের একটি অধিবেশনে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিল পাসের তীব্র বিরোধিতা করে ওয়াকআউট করেছেন বিরোধীদলের আইনপ্রণেতারা। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল এবং সম্পত্তি হস্তান্তর বিল পাসের প্রক্রিয়া শুরু হলে এই নজিরবিহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অধিবেশন কক্ষ ত্যাগের সময় বিরোধীদলীয় সদস্যরা তাদের মুখে কালো কাপড় বেঁধে সংসদ ভবন থেকে বেরিয়ে আসেন। সংসদের ভেতরে সরকারের একতরফা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করতেই মূলত তারা এই প্রতীকী প্রতিবাদের পথ বেছে নেন। অধিবেশন বর্জনের পর তারা সংসদ ভবনের টানেলে একটি তাৎক্ষণিক সংবাদ সম্মেলন করে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির তীব্র সমালোচনা করেন। বিরোধীদলের শীর্ষ নেতারা এই দিনটিকে দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে একটি কালো দিন হিসেবে অভিহিত করেছেন।

সংবাদ সম্মেলনে বিরোধীদলীয় নেতারা স্পিকারের বিরুদ্ধে চরম পক্ষপাতমূলক আচরণের গুরুতর অভিযোগ তোলেন। জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে সংসদ সদস্যরা অধিবেশন থেকে বেরিয়ে আসেন। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন যে, সংসদের নিয়ম অনুযায়ী বিরোধীদলীয় নেতা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা বলতে চাইলেও স্পিকার তাকে সেই সুযোগ দেননি। বরং স্পিকার এ বিষয়ে মশকরা করেছেন বলে দাবি করে তিনি একে অত্যন্ত হতাশাজনক বলে উল্লেখ করেন। তাদের মতে, বিরোধীদলের কোনো মতামত বা সংশোধন প্রস্তাবের তোয়াক্কা না করেই সরকার তড়িঘড়ি করে বিতর্কিত বিলগুলো পাস করে নিয়েছে। এই ধরনের একপেশে কার্যক্রম সংসদীয় রীতিনীতির পরিপন্থী এবং জনগণের অধিকারের পরিপন্থী বলে তারা মন্তব্য করেন।

বিশেষ করে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল পাসের তীব্র সমালোচনা করেন বিরোধীদলের প্রতিনিধিরা। চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, পাস হওয়া এই বিলগুলোতে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত করার ন্যূনতম সুযোগ রাখা হয়নি, যা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। সরকার মানবাধিকার সুরক্ষার কথা বললেও বাস্তবে এসব আইনের মাধ্যমে জনগণের অধিকার খর্ব করা হয়েছে বলে তারা দাবি করেন। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর সংসদীয় মুখপাত্র নজিবুর রহমান সম্পত্তি হস্তান্তর বিলটিকে স্পষ্টভাবে কোরআন ও সুন্নাহর বিধানের পরিপন্থী বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি আইনমন্ত্রীর কঠোর সমালোচনা করে বলেন, ইসলামি অনুশাসনের সঠিক ধারণা না রেখেই আইনমন্ত্রী সংসদে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভুলভাবে উপস্থাপন করেছেন।

বিরোধীদলের নেতারা আরও অভিযোগ করেন যে, স্পিকারের প্রধান সাংবিধানিক দায়িত্ব ছিল নিরপেক্ষ থেকে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, কিন্তু তিনি তা পালনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। সরকার মানবাধিকার ও গুম প্রতিরোধের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোকে আরও শক্তিশালী করার পরিবর্তে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দুর্বল করে আইন পাস করেছে বলে তাদের অভিমত। এই আইনগুলোকে ‘কালো আইন’ অভিহিত করে নেতারা হুঁশিয়ারি দেন যে, এর মাধ্যমে মানুষের মৌলিক মানবাধিকার হরণ করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে নিপীড়নের পথ আবার প্রশস্ত করা হলো। বিগত ১৭ বছরের সীমাহীন নির্যাতন ও নিপীড়নের ইতিহাস ভুলে গিয়ে সরকার আবারও আগের মতো একতরফা পথেই দেশ পরিচালনা করছে বলে তারা তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *