৩৭ বছরের শিক্ষকতা শেষে ঘোড়ার গাড়িতে রাজকীয় বিদায়

দীর্ঘ ৩৭ বছরের বর্ণাঢ্য শিক্ষকতা জীবন সফলভাবে শেষ করে অবসরে গেছেন চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার জোরারগঞ্জ আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক বিপুল চন্দ্র দে। শিক্ষকতা পেশার প্রতি ভালোবাসা এবং তার দীর্ঘ কর্মময় জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাকে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ ও ব্যতিক্রমী উপায়ে বিদায় সংবর্ধনা প্রদান করা হয়েছে। সম্প্রতি বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক আবেগঘন অনুষ্ঠানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও এলাকার সর্বস্তরের মানুষ প্রিয় এই শিক্ষকের প্রতি তাদের গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। বর্ণাঢ্য এই আয়োজনের মাধ্যমে বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে তাকে চিরস্মরণীয় এক বিদায় উপহার দেওয়া হয়, যা উপস্থিত সবার হৃদয়ে গভীর দাগ কেটেছে।

বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজিত বিদায়ী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে স্কাউট সদস্য ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিপুল চন্দ্র দেকে করতালি ও ফুলেল শুভেক্ষায় সিক্ত করেন। প্রাত্যহিক সমাবেশে তাকে সম্মানসূচক গার্ড অব অনার প্রদান করা হয় এবং পরিবেশিত হয় মনোমুগ্ধকর বিদায়ী সংগীত। এরপর বিদ্যালয় মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত প্রধান পর্বে সহকর্মীদের স্মৃতিচারণ, শিক্ষার্থীদের আবেগঘন বক্তব্য, মানপত্র পাঠ, নাটিকা পরিবেশন এবং বিশেষ উপহার সামগ্রী বিতরণের মাধ্যমে অনুষ্ঠানটি আরও বর্ণিল হয়ে ওঠে। দীর্ঘ কর্মজীবনের স্বীকৃতিস্বরূপ চলতি বছর তাকে বিদ্যালয়ের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবেও ঘোষণা করা হয়, যা তার পেশাগত দক্ষতার বড় এক স্বীকৃতি।

১৯৮৯ সালের আগস্ট মাসে করেরহাট কামিনী মজুমদার উচ্চ বিদ্যালয়ে গণিতের সহকারী শিক্ষক হিসেবে শিক্ষকতা জীবন শুরু করেছিলেন বিপুল চন্দ্র দে। সেখানে প্রায় বাইশ বছর সফলভাবে দায়িত্ব পালনের পর ২০১১ সালের অক্টোবর মাসে তিনি জোরারগঞ্জ আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। এই প্রতিষ্ঠানে প্রায় পনেরো বছর ধরে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে শিক্ষা দান এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করে তিনি এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। পেশাগত জীবনের এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় তার সততা, নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতা বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মাঝে গভীর শ্রদ্ধার স্থান করে নিয়েছে।

আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শেষে প্রিয় শিক্ষককে রাজকীয় ঢঙে ঘোড়ার গাড়িতে বসিয়ে তার নিজ বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া হয়। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের এমন অভিনব ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ দেখে বিদায়ী শিক্ষক বিপুল চন্দ্র দে এবং উপস্থিত অতিথিরা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। বিদায়ী বক্তব্যে তিনি জানান যে শিক্ষকতা তার কাছে নিছক কোনো পেশা নয়, বরং জীবনের সবচেয়ে বড় ভালোবাসা ও ব্রত। শিক্ষার্থীদের শুধু ভালো ফলাফল অর্জনের পেছনে না ছুটে সততা, মানবিকতা ও নৈতিক মূল্যবোধ সম্পন্ন ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার আহ্বান জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে জোরারগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের সভাপতি আবুল হাশেম ভূঁইয়া বলেন যে, একজন আদর্শ শিক্ষকই মূলত জাতি গঠনের মূল কারিগর এবং বিপুল চন্দ্র দে তার দীর্ঘ কর্মজীবনে অসংখ্য শিক্ষার্থীকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করেছেন। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাইফুল আলমও তার বক্তব্যে বিপুল চন্দ্র দেকে একজন দক্ষ শিক্ষকের পাশাপাশি অভিভাবক হিসেবে অভিহিত করেন। সহকর্মীদের মতে, তার এই কর্মনিষ্ঠা ও অনন্য অবদান বিদ্যালয়ের ইতিহাসে চিরকাল সোনালী অক্ষরে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *