এফবিআইয়ের সব এজেন্টের গোপনীয় তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার দাবি হ্যাকারদের

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইয়ের প্রায় ৩৮ হাজার কর্মীর অত্যন্ত সংবেদনশীল ও ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার চাঞ্চল্যকর দাবি করেছে ‘সাইনিহান্টার্স’ নামের একটি আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধী গোষ্ঠী। এই বিশাল তথ্য ফাঁসের ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে মার্কিন প্রশাসন এবং সংস্থাটির পক্ষ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পুরো বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। হ্যাকারদের দাবি অনুযায়ী, চুরি হওয়া এই নথিপত্রের মধ্যে প্রতিটি এজেন্টের পূর্ণ নাম, ব্যক্তিগত ফোন নম্বর, পদবি, ব্যাজ নম্বর, আবাসিক ঠিকানা এবং তাদের জীবনসঙ্গীর বিস্তারিত তথ্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, এই ডেটাবেইসটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যেখানে সংস্থার অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সংবেদনশীল বিষয়ের বিশদ বিবরণ রয়েছে।

ফাঁস হওয়া তথ্যের বিশাল এই ভান্ডারের মধ্যে রয়েছে চীন ও রাশিয়ার গোয়েন্দা কার্যক্রম এবং আন্তর্জাতিক মাদক চক্রের বিরুদ্ধে নিয়োজিত শীর্ষ কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ও কার্যক্রম সংক্রান্ত গোপনীয় সব উপাত্ত। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি সেন্টারের সাবেক প্রধান অধ্যাপক কিয়েরান মার্টিন এই সাইবার হামলার তীব্রতা প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেন যে, হ্যাকারদের এই দাবি সত্যি প্রমাণিত হলে তা সাইবার নিরাপত্তা ও তথ্য ফাঁসের বৈশ্বিক ইতিহাসে অন্যতম বড় বিপর্যয় হিসেবে চিহ্নিত হবে। বিশ্বখ্যাত সংবাদমাধ্যম বিবিসি ইতিমধ্যেই চুরি যাওয়া তথ্যের একটি ছোট নমুনা যাচাই করে দেখেছে এবং প্রাথমিক বিশ্লেষণে সেগুলো প্রকৃত বলেই তাদের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে। সাধারণত এ ধরনের সাইবার আক্রমণগুলো বড় অঙ্কের আর্থিক সুবিধা আদায়ের উদ্দেশ্যে পরিচালিত হলেও, এই নির্দিষ্ট ঘটনার পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য কাজ করেছে বলে জানা গেছে।

সাইনিহান্টার্স গোষ্ঠীটি জানিয়েছে যে তারা কোনো অর্থ পাওয়ার জন্য এফবিআইয়ের ডিজিটাল সিস্টেমে অনুপ্রবেশ করেনি, বরং এটি ছিল একটি প্রতিশোধমূলক আক্রমণ। কিছুদিন আগে এফবিআই এই হ্যাকার দলটিকে একটি অপরাধী চক্র এবং অতিরঞ্জিত দাবি পেশকারী হুমকিদাতা হিসেবে চিহ্নিত করে একটি সতর্কবার্তা প্রকাশ করেছিল। সেই সতর্কবার্তায় ক্ষুব্ধ হয়েই হ্যাকাররা মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার ওপর এই বড় ধরনের আঘাত হানার পরিকল্পনা করে। ডার্ক ওয়েবে প্রকাশিত এক বার্তায় হ্যাকাররা এফবিআইকে তাদের সম্পর্কে দেওয়া মিথ্যা অভিযোগ ও সতর্কবার্তাটি প্রত্যাহার করার জন্য মাত্র এক সপ্তাহের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাদের দাবি মেনে নেওয়া না হলে সংগৃহীত পুরো ডেটাবেইস জনসমক্ষে উন্মুক্ত করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে এই সাইবার অপরাধীরা।

হ্যাকারদের ভাষ্যমতে, তারা ওরাকল ক্লাউড স্টোরেজ সিস্টেমের একটি নিরাপত্তা ত্রুটির সুযোগ নিয়ে এফবিআইয়ের মূল ডেটাবেইসে প্রবেশাধিকার লাভ করে। পরবর্তীতে তারা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সংবাদকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে চুরি করা তথ্যের নমুনা ও স্ক্রিনশট পাঠাতে শুরু করে। এই সাইবার হামলার ফলে এফবিআইয়ের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কার্যপ্রণালী ও সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এফবিআই জানিয়েছে যে তারা ঘটনাটি সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল রয়েছে এবং এটি নিয়ে গভীরভাবে কাজ করছে। তবে হামলাটি সরাসরি এফবিআইয়ের নিজস্ব সার্ভারে চালানো হয়েছে, নাকি কোনো তৃতীয় পক্ষের সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা থেকে তথ্য বেহাত হয়েছে, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এফবিআইয়ের মতো একটি অত্যন্ত সুরক্ষিত সরকারি সংস্থাকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে হ্যাকাররা মূলত নিজেদের আধিপত্য ও সামর্থ্যের জানান দিতে চাইছে। ক্লোজড ডোর সিকিউরিটির বিশেষজ্ঞ উইলিয়াম রাইট জানান, এই ধরনের হামলার মাধ্যমে হ্যাকার গোষ্ঠীগুলো নিজেদের সুনাম ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার বার্তা দিয়ে থাকে। এদিকে হান্ট্রেস প্রতিষ্ঠানের অ্যানড্রু ব্রান্ড মনে করেন, সরকারি সংস্থাকে প্রকাশ্যে এভাবে হুমকি দেওয়া অপরাধীদের চরম আত্মবিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ, যা শেষ পর্যন্ত আইন প্রয়োগকারী সংস্থাদের তাদের খুঁজে বের করতে আরও বেশি তাড়িত করবে। উল্লেখ্য, ফ্রান্সে গঠিত হয়েছে বলে ধারণা করা এই সাইনিহান্টার্স এর আগেও বেশ কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানে সফল সাইবার হামলা চালিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *