শিশুদের অনলাইন ঝুঁকি ঠেকাতে বৈশ্বিক উদ্যোগের আহ্বান আইসিটি মন্ত্রীর

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ডিজিটাল পরিবেশে শিশুদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং অংশীজনদের যৌথ উদ্যোগ নেওয়ার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে বাংলাদেশ। সম্প্রতি রাশিয়ার মস্কোয় আয়োজিত “ডিজিটাল চাইল্ডহুড উইদাউট বর্ডারস: বেস্ট ইন্টারন্যাশনাল প্র্যাকটিসেস ফর চাইল্ড সেফটি অনলাইন” শীর্ষক এক উচ্চপর্যায়ের প্রাতরাশ বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল এই আহ্বান জানায়। দেশের ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এই আন্তর্জাতিক বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে অংশ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দেন। এ সময় তিনি সময়োপযোগী এই উদ্যোগ আয়োজনের জন্য গ্লোবাল ডিজিটাল ফোরাম ও অ্যালায়েন্স ফর দ্য প্রোটেকশন অব চিলড্রেন ইন দ্য ডিজিটাল এনভায়রনমেন্টকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। বিশ্বের শতাধিক দেশের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এই আন্তর্জাতিক ফোরামটি শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনার একটি বড় প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করেছে।

বৈঠকে নিজের বক্তব্যে মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানান যে বাংলাদেশ বর্তমানে অত্যন্ত দ্রুতগতির ডিজিটাল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছে। এই অগ্রগতির ফলে দেশের শিশুরা শিক্ষা গ্রহণ ও ব্যক্তিগত বিকাশের জন্য ইন্টারনেটের বিশাল সুযোগ-সুবিধা সহজে উপভোগ করতে পারছে। তবে এর পাশাপাশি প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে তারা নিত্যনতুন ও পরিবর্তনশীল নানা ধরনের অনলাইন ঝুঁকির মুখোমুখিও হচ্ছে। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ তৈরি করা কেবল অভিভাবক কিংবা শিক্ষকদের একার দায়িত্ব নয়। বরং এই বিশাল দায়িত্ব পালনের জন্য সরকার, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের একযোগে কাজ করতে হবে।

আইনি কাঠামোর দিকটি তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন যে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে শিশুদের তথ্য সুরক্ষা এবং অনলাইন শোষণ রোধে সাইবার সিকিউরিটি আইনসহ সংশ্লিষ্ট আইনি বিধানগুলো আরও শক্তিশালী করার কাজ চলছে। তবে তিনি মনে করেন যে শুধুমাত্র জাতীয় আইন প্রণয়ন করে এই বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। এজন্য বিভিন্ন দেশের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, সর্বাধুনিক প্রযুক্তিগত সমাধান এবং কার্যকর অনুশীলনগুলো একে অপরের সঙ্গে বিনিময় করা অত্যন্ত জরুরি। এ সময় মস্কোর অনুষ্ঠানে গ্লোবাল অ্যালায়েন্স টু প্রটেক্ট চিলড্রেন ইন দ্য ডিজিটাল এনভায়রনমেন্টের খসড়া যৌথ ঘোষণা ও টিওআর পর্যালোচনার বিষয়টি তুলে ধরে রাশিয়াকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানান তিনি। প্রস্তাবিত এই দলিলটি জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের আলোকে শিশুদের অধিকারকেন্দ্রিক একটি পূর্ণাঙ্গ ও সমন্বিত কাঠামো তৈরি করেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

উদ্যোগটির মূল তিনটি নীতির প্রতি বাংলাদেশের পূর্ণ সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করে মন্ত্রী জানান যে শিশুর সর্বোচ্চ স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া, যৌথ দায়বদ্ধতা এবং অভিজ্ঞতা বিনিময় অত্যন্ত আবশ্যক। তিনি এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলসহ বিশ্বের প্রতিটি ভৌগোলিক অঞ্চলের ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী বহুপক্ষীয় কাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জগুলো বৈশ্বিক কৌশলে সঠিকভাবে প্রতিফলিত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তাছাড়া, শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা সূচক এবং বিশেষ গবেষণামূলক প্ল্যাটফর্ম গঠনের প্রস্তাবকেও বাংলাদেশ ইতিবাচকভাবে স্বাগত জানিয়েছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশের এই যুগে ডিজিটাল সাক্ষরতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই বলে উল্লেখ করেন মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। শিশু, অভিভাবক এবং শিক্ষকদের যথাযথ জ্ঞান ও সচেতনতা বৃদ্ধি করতে পারলে অনলাইন সহিংসতার বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। অনলাইন বুলিং, যৌন হয়রানি ও তথ্য চুরির মতো অপরাধ থেকে আগামী প্রজন্মকে রক্ষা করতে এই আন্তর্জাতিক জোটের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন তিনি। জাতীয়তার ভেদাভেদ ভুলে বিশ্বের প্রতিটি শিশু যেন সম্পূর্ণ নিরাপদে ও নির্ভয়ে ডিজিটাল বিশ্ব অন্বেষণ করতে পারে, বাংলাদেশ সেই লক্ষ্য অর্জনেই কাজ করে যাচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *