শিশু-কিশোরদের সোশ্যাল মিডিয়ায় নিষেধাজ্ঞা কি কাজ করছে?

শিশু ও কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের জন্য বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশ কঠোর আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করছে। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ায় ১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট খোলার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে, যা অভিভাবকদের মধ্যে সাময়িকভাবে আশার সঞ্চার করেছিল। তবে বাস্তবে এই ধরনের কঠোর উদ্যোগ কতটা ফলপ্রসূ হচ্ছে, তা নিয়ে ইতোমধ্যে বড় ধরনের প্রশ্ন ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। নীতিনির্ধারকেরা তরুণ প্রজন্মকে অনলাইন প্ল্যাটফর্মের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে সুরক্ষা দিতে চাইলেও, বাস্তবে এসব নিয়ম এড়িয়ে যাওয়ার নানা পথ খুঁজে নিচ্ছে কিশোর-কিশোরীরা। ফলস্বরূপ, আইন প্রণয়ন করা হলেও ব্যবহারকারীদের দৈনন্দিন অভ্যাসে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।

অস্ট্রেলিয়ার এই নিষেধাজ্ঞার পর সাধারণ পরিবারের অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায় যে, বাস্তবে এই নিয়ম খুব একটা কাজ করছে না। যেমন, ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরের মা হারিনি নাইডু সন্তানের অনলাইন আসক্তি কমাতে নানা রকম কড়াকড়ি করলেও সরকারের নতুন নিয়ম জারির পর পরিস্থিতির কোনো উন্নতি দেখেননি। তার ছেলের ইউটিউব অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে গেলেও সে লগইন ছাড়াই দিব্যি ভিডিও দেখে চলেছে, আর তার ১৫ বছর বয়সী মেয়ের এক্স, ইনস্টাগ্রামসহ অন্যান্য জনপ্রিয় মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট বহাল রয়েছে। কিশোর-কিশোরীরা ভুয়া জন্মতারিখ ব্যবহার করে কিংবা পরিবারের অন্য সদস্যদের পরিচয়পত্র দিয়ে সহজেই বয়স যাচাইয়ের প্রক্রিয়া এড়িয়ে যাচ্ছে। অনেকে আবার যৌথ অ্যাকাউন্ট খুলে নিষেধাজ্ঞা পাশ কাটিয়ে আগের মতোই অনলাইনে সক্রিয় থাকছে, যা প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণের কার্যকারিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

অস্ট্রেলিয়ার পাশাপাশি নিউজিল্যান্ড, যুক্তরাজ্য এবং ডেনমার্কের মতো দেশগুলোও অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কিছু অঙ্গরাজ্যেও মেটার মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য স্ক্রল করার সময়সীমা সীমিত করতে সম্মত হয়েছে। তবে ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নালে প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, নিষেধাজ্ঞা চালুর তিন মাস পরও বিপুল সংখ্যক কিশোর-কিশোরী নিষিদ্ধ প্ল্যাটফর্মগুলো নিয়মিত ব্যবহার করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মুখচ্ছবি স্ক্যান করার মতো বয়স যাচাইয়ের আধুনিক প্রযুক্তিগুলোও শতভাগ নির্ভুলভাবে কাজ করছে না, ফলে ১৫ বা ১৬ বছর বয়সী তরুণদের সঠিক বয়স শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় মালয়েশিয়ার মতো কিছু দেশ অ্যাকাউন্ট খোলার সময় জাতীয় পরিচয়পত্রভিত্তিক যাচাই পদ্ধতি বাধ্যতামূলক করার কথা ভাবছে। তবে পরিচয়পত্রের তথ্য সংরক্ষণ এবং তা হ্যাকিংয়ের কবলে পড়ার মতো সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে বিশেষজ্ঞরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এছাড়া, শুধু কঠোর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সবকিছু বন্ধ না করে প্ল্যাটফর্মগুলোকে আরও বেশি নিরাপদ করে তোলার ওপর জোর দিচ্ছেন অনেকে। কানাডার মতো দেশগুলো নির্দিষ্ট নিরাপত্তা মানদণ্ড পূরণ সাপেক্ষে শিশুদের প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার ভিন্ন চিন্তাভাবনা করছে। তাই কেবল নিষেধাজ্ঞা নয়, বরং বয়স যাচাইয়ের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহিতা এবং কিশোর-কিশোরীদের নিজেদের ডিজিটাল সচেতনতা—সবকিছু মিলিয়েই একটি সমন্বিত ও টেকসই সমাধান খোঁজার সময় এসেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *