সিজারিয়ানের পর পেটে গজ রেখে সেলাই, সংকটাপন্ন বীথি বাঁচতে চান সন্তানের জন্য

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সন্তান প্রসবের সময় চিকিৎসকদের চরম অবহেলার শিকার হয়ে বর্তমানে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন বীথি আক্তার নামের এক প্রসূতি। মাসকয়েক আগে ওই হাসপাতালে তাঁর সিজারিয়ান অপারেশন করা হয়েছিল, যার সময় পেটের ভেতর গজ কাপড় রেখেই সেলাই করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। এই তরুণী মা রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার উজানচর ইউনিয়নের জামতলার হাট এলাকার রাকিবুল ইসলামের স্ত্রী এবং তিনি নিজে ফরিদপুর শহরের একটি নার্সিং কলেজের শিক্ষার্থী ও হাসপাতালের প্রশিক্ষণার্থী ছিলেন। বর্তমানে তিনি অত্যন্ত জীর্ণ ও সংকটাপন্ন অবস্থায় ওই হাসপাতালের গাইনি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। হাসপাতালটির বিছানায় শুয়ে হাতজোড় করে কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি নিজের উন্নত চিকিৎসার আকুতি জানিয়ে বলেন যে তিনি তাঁর সন্তানকে বুকে নিয়ে বাঁচতে চান।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত মে মাসের ৬ তারিখে ডা. তামান্না আক্তার ও ইন্টার্ন চিকিৎসক অরবিন্দু বীথির অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করে একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। এর কয়েক দিন পর তিনি স্বামীর বাড়িতে ফিরে গেলে তাঁর শরীরে একের পর এক শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে শুরু করে। রোগীর অবস্থা গুরুতর হলে তাঁকে অপারেশনকারী চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া হলেও তিনি কোনো বড় সমস্যা নেই বলে আশ্বস্ত করে ফিরিয়ে দেন। কিন্তু শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটলে পরিবার দুটি বেসরকারি হাসপাতালে আল্ট্রাসনোগ্রাম করায়, যেখানে তাঁর পেটের ভেতরে গজ কাপড় থাকার বিষয়টি ধরা পড়ে। পরবর্তীতে গত জুলাই মাসে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই দ্বিতীয় দফা অস্ত্রোপচার করে ওই গজ বের করা হয়, ততদিনে তাঁর পেটের নাড়ি পচে মারাত্মক সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছিল।

ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ করা হয়েছে যে, দ্বিতীয় অস্ত্রোপচারের পর প্রথম দফার অপারেশনকারী চিকিৎসক তামান্না আক্তারকে ডেকে ৪০ হাজার টাকায় ঘটনাটি আপস করা হয় এবং পরবর্তীতে যাতে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া না হয় সেজন্য জোরপূর্বক একটি চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। এরপর কিছুদিন বাড়ি থাকার পর গত সেপ্টেম্বর মাসে সংক্রমণের মাত্রা অতিরিক্ত বেড়ে গেলে বীথিকে পুনরায় অত্যন্ত জরুরি অবস্থায় এই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শুরুতে তাঁকে চার দিন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং বর্তমানে তিনি গাইনি বিভাগে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। রোগীর মা মনোয়ারা বেগম জানিয়েছেন যে দীর্ঘ চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে দুটি পরিবারই আজ সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছে এবং বীথির শারীরিক অবস্থা প্রতিনিয়ত অবনতির দিকে যাচ্ছে।

এদিকে এই ঘটনায় হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মানস কৃষ্ণ কুন্ডু দাবি করেছেন যে পেটে গজ কাপড় রেখে সেলাই করার অভিযোগ সঠিক নয় এবং সংক্রমণের কারণেই মূলত হার্ট ব্লকসহ অন্যান্য জটিলতা তৈরি হয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন যে রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক নয় এবং দ্বিতীয়বার কোনো অস্ত্রোপচার না করে কেবল বাইপাস সার্জারি করা হয়েছে, তবে সুচিকিৎসার জন্য ইতিমধ্যে একটি মেডিকেল বোর্ড ও তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। অন্যদিকে হাসপাতালের এই বক্তব্য সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়ে রোগীর স্বামী রাকিবুল ইসলাম বেসরকারি হাসপাতালের আল্ট্রাসনোগ্রাম প্রতিবেদনগুলো সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন। গর্ভের ভেতর গজ থাকার কথা দ্বিতীয় অস্ত্রোপচারে প্রমাণিত হয়েছে এবং এক সেবিকাতো বিষয়টি তাঁদের নিশ্চিতও করেছিলেন বলে দাবি করেন তিনি। এমন অবস্থায় অসহায় এই তরুণীর জীবন বাঁচাতে সরকারের কাছে দ্রুত উন্নত সুচিকিৎসার দাবি জানিয়েছেন তাঁর পরিবার ও স্বজনেরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *